দেশে নগরায়ণ বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন, সড়ক, শিল্প ও অন্যান্য অবকাঠামোর চাহিদাও বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জলবায়ুগত সংকট। এতে কৃষিজমি ও উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। মানববসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণ ও নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছর গড়ে দশমিক ২৪ শতাংশ হারে কৃষিজমি চাষের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে উৎপাদনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি কৃষিজমি। দেশের জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এ পরিস্থিতিতে কৃষিজমি সুরক্ষিত রাখা না গেলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে। এ বিষয় নিয়েই এবারের কৃষি ও কৃষক পাতার প্রধান ফিচার
সম্প্রতি কৃষি সাংবাদিকদের এক কর্মশালায় দেশের কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম। তার উপস্থাপনায় দেশে কৃষিজমি কমে যাওয়ার চিত্র উঠে আসে। তার মতে, ‘কৃষিজমির সুরক্ষা ও ভূমি অবক্ষয়’ দেশের কৃষির ছয়টি বড় চ্যালেঞ্জের একটি। তিনি জানান, প্রতি বছর গড়ে ৬৯ হাজার হেক্টর জমি কৃষির বাইরে চলে যাচ্ছে। এর আগে গত নভেম্বরে রাজধানীতে বাংলাদেশ এগ্রোইকোলজি প্লাটফর্ম আয়োজিত ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালায় জানানো হয়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। কর্মশালায় তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার উপস্থিত ছিলেন।
বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান তার উপস্থাপনায় বলেন, ১৯৭৬ সালে দেশে চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৯৮ লাখ হেক্টর। ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮৩ দশমিক ৩ লাখ হেক্টরে। এ সময়ে কৃষিজমি কমার বার্ষিক হার ছিল দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে ভূমি ব্যবহার জরিপ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, দেশে আবাদযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেশে কৃষিজমি কমার বার্ষিক হার দশমিক ৩৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিজমি হারানোর প্রভাব শুধু ফসল উৎপাদনের জমি কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জমি খণ্ডিত হলে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার, সেচ ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণও কঠিন হয়ে পড়ে। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় জমি হারানোর সঙ্গে কৃষকের আয় ও জীবিকার অনিশ্চয়তাও বাড়ে। পাশাপাশি চরাঞ্চলে নদীভাঙন, উপকূলে লবণাক্ততা, বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস এবং হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার মতো ভৌগোলিক ঝুঁকিও কৃষিকে ক্রমাগত চাপে রাখছে।
কৃষি বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্যা, আকস্মিক বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত তাপ, ভূমিধস, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন সংকট কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তারও বাড়ছে। ১৯৭৩ সালে লবণাক্ততায় আক্রান্ত এলাকার পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩৩ লাখ হেক্টর; ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৫৬ লাখ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় কৃষিজমি কমে যাওয়া এ সংকটকে আরো বাড়াবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চলতি মূল্যে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ (সাময়িক হিসাব)। আর কর্মসংস্থানের ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ কৃষিজমির সংকোচন শুধু খাদ্যোৎপাদন নয়, বিপুল জনগোষ্ঠীর আয় ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যানের উপস্থাপনায় সীমিত জমি থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে চাল উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা ১৯৮০ সালে ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ টন। প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাত, সেচ, সার ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণ এ উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দেশের কৃষিতে শুধু জমি কমে যাওয়াই চ্যালেঞ্জ নয়। এর পাশাপাশি রয়েছে উৎপাদন ও জলবায়ু ঝুঁকি, প্রযুক্তি গ্রহণে আর্থসামাজিক বাধা, খাদ্যনিরাপত্তার চাপ ও প্রতিকূল পরিবেশে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। কৃষকের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি, প্রযুক্তি সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা, কৃষি উপকরণ ও ঋণে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তির উচ্চ ব্যয় আধুনিক কৃষিতে রূপান্তরের পথে বাধা হয়ে আছে। বাজার ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে দুর্বলতা। কার্যকর কৃষক সংগঠন বা সমবায় না থাকায় কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা কম। মূল্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন ও ফসল বীমার সীমিত সুযোগ ছোট কৃষকের ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে রফতানিমুখী কৃষিতে মান নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মান অনুসরণ ও পণ্যের উৎস শনাক্তকরণেও দুর্বলতা রয়েছে।
দেশে কৃষিজমি কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে চাষের জমির পরিমাণ ১ কোটি ৮৬ লাখ একর বা ৭৫ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর। জনপ্রতি কৃষিজমির প্রাপ্যতা মাত্র ১১ শতক বা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিঘা। অথচ বিশ্বে জনপ্রতি কৃষিজমির গড় প্রাপ্যতা প্রায় তিন একর। ১৯৮৩-৮৪ সালে দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯২ লাখ হেক্টর। ১৯৯৬ সালে তা কমে ৮২ লাখ, ২০০৮ সালে ৭৭ লাখ ও ২০১৯ সালে ৭৫ লাখ হেক্টরে নেমে আসে। ১৯৮৪-৯৬ সময়ে আবাদি জমি কমার বার্ষিক গড় হার ছিল দশমিক ৯৬ শতাংশ। ১৯৯৬-২০০৮ সময়ে এ হার ছিল দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ২০০৮-১৯ সময়ে দশমিক ২২ শতাংশ। সব মিলিয়ে ১৯৮৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কৃষিজমি কমার বার্ষিক গড় হার ছিল দশমিক ৫৮ শতাংশ। এ সময়ে বছরে গড়ে ৪৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর বা দৈনিক প্রায় ১৩৩ হেক্টর কৃষিজমি আবাদের বাইরে চলে গেছে। কৃষিজমি কমার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, নতুন সড়ক ও বসতবাড়ি নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইটভাটা স্থাপন ও নদীভাঙন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে কৃষিজমিকে সুরক্ষা দিতে ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি করে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস করে। আইনটি কৃষিজমি রক্ষায় ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আইনটির কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিজমির সুরক্ষা দেয়া সম্ভব। বর্তমানে প্রতি বছর দশমিক ২২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। এটিকে দশমিক ১০ থেকে দশমিক ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষকে সচেতন হতে হবে।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬