গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

ঋণ নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা, তবু ব্যাংকে টাকা নেই

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:২৭ পিএম, ০৮ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৫৫ এএম ২০২৬
ঋণ নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা, তবু ব্যাংকে টাকা নেই
ছবি

ছবি সংগৃহীত

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা যখন ব্যাংক থেকে কম ঋণ নেন, তখন ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ বা তারল্য বাড়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দেখা যাচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। উদ্যোক্তারা নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন না, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে কয়েক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে; অথচ অনেক ব্যাংক এখনো তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে। এমনকি গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতেও কিছু ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। এর অর্থ হলো, নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে। সাধারণ হিসাবে, এতে ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সংকটাপন্ন কয়েকটি ব্যাংক প্রতিদিনের লেনদেন চালাতেও হিমশিম খাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শুধু ইসলামী ব্যাংককে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি জরুরি তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে। গত দেড় বছরে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া মোট সহায়তার পরিমাণ ৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ব্যবসায়ীরা ঋণ না নিলেও ব্যাংকের টাকা গেল কোথায়?

দীর্ঘদিনের অনিয়মের খেসারত: ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল সাময়িক তারল্য ঘাটতি নয়; এটি দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল। বিগত সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, অতিরিক্ত ঋণ অনুমোদন, একই গ্রুপকে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া এবং দুর্বল জামানতের বিপরীতে অর্থ ছাড়ের কারণে অনেক ব্যাংকের সম্পদের মান নষ্ট হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কিংবা এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ হয়েছে, যেখান থেকে অর্থ আর ব্যাংকে ফিরে আসেনি। ফলে ব্যাংকের হিসাবের খাতায় ঋণ সম্পদ হিসেবে থাকলেও বাস্তবে সেই অর্থ নগদ প্রবাহে নেই।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ কমে যাওয়াই বর্তমান সমস্যার মূল কারণ নয়। বরং পুরোনো ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়া এবং অর্থ ফেরত না আসাই বড় সংকট তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। সমস্যাগ্রস্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।

ইসলামী ব্যাংকগুলোতে চাপ বেশি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। কিছু ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাতও অত্যধিক বেড়ে গেছে। অর্থাৎ তারা যত আমানত সংগ্রহ করেছে, তার তুলনায় বেশি ঋণ বিতরণ করেছে।

ফলে আমানতকারীরা একসঙ্গে টাকা তুলতে এলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ তারল্য সহায়তা, পুনঃক্রয় চুক্তি সুবিধা ও জরুরি অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সহায়তা কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; মূল সমস্যা সমাধান করতে পারে না।

বিনিয়োগে আস্থা হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা: ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থের প্রাপ্যতা নয়, বরং বিনিয়োগ পরিবেশের অনিশ্চয়তা। উচ্চ সুদের হার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজারে চাপ, ডলারের অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উদ্যোক্তারা বড় বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কয়েক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা শুধু ব্যাংকিং খাতের পরিসংখ্যান নয়, এটি দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র।

তিনি বলেন, সাধারণভাবে ব্যবসায়ীরা ঋণ কম নিলে ব্যাংকের তারল্য বাড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ব্যাংক এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হলো, সমস্যা নতুন ঋণ বিতরণে নয়; বরং অতীতে দেওয়া বিপুল ঋণ আদায় না হওয়া, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং সুশাসনের ঘাটতিতে।

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, পোশাকসহ উৎপাদনমুখী শিল্পের অনেক উদ্যোক্তা বর্তমানে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

আমানত বাড়ছে, কিন্তু সব ব্যাংকে নয়: বিরোধপূর্ণ হলেও বাস্তবতা হলো, ব্যাংক খাতে মোট আমানতের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে।

তবে এই আমানতের বড় অংশ যাচ্ছে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও সুশাসনসম্পন্ন ব্যাংকগুলোতে। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে নতুন আমানত কমছে, বরং অনেক গ্রাহক পুরোনো আমানত তুলে নিচ্ছেন। ফলে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি আরো দুর্বল হচ্ছে।

সংস্কার চলছে, তবে পথ কঠিন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ব্যাংক একীভূতকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম এক বা দুই বছরে দূর করা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে স্থায়ী আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কার্যকর সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

আস্থার সংকটই বড় চ্যালেঞ্জ: বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট শুধু অর্থের সংকট নয়, এটি মূলত আস্থার সংকট। একদিকে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে পিছিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকের গ্রাহকেরা আমানত নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তাই শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

কারণ ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না, অথচ ব্যাংকে টাকা নেই-এই বৈপরীত্যের সমাধান নিহিত রয়েছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার গভীর ও কার্যকর সংস্কারের মধ্যেই।
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তন, আসছে ঋণ-স্বাস্থ্যবিমা
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তন, আসছে ঋণ-স্বাস্থ্যবিমা

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরো আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করতে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা যুক...

সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বড় পরিকল্পনা, ২০৩০ সালের মধ্যে মিলবে ৬৮৯ মেগাওয়াট
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বড় পরিকল্পনা, ২০৩০ সালের মধ্যে মিলবে ৬৮৯ মেগাওয়াট

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) নিজস্ব অর্থায়নে ২০৩০ সালের মধ্যে সারাদেশে ৬৮৯ মেগাওয়াট ক্ষম...

বেড়েছে দাম, কমেছে কেক-পাউরুটির আকার
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেড়েছে দাম, কমেছে কেক-পাউরুটির আকার

রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায় বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বেকারিতে তৈরি খোলা পাউরুটি ও কেক। কোথাও পণ্যের দাম...

তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুখবর
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুখবর

উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘উদ্যোগ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

জুয়া ও মাদক অনেক অপরাধের মূল কারণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বর্তমানে সংঘটিত অনেক অপরাধের পেছনে জুয়া ও মাদককে অন্যতম মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, অপরাধের পর শুধু গ্রেফতার, বিচার ও শাস্তি দিলেই এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অপরাধ কেন সংঘটিত হচ্ছে, তার মূল কারণ খুঁজে বের করে তা মোকাবিলা করতে হবে। প্রিয় পাঠক, মন্ত্রীর কথার সঙ্গে আপনি কি একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 ঘন্টা আগে