একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম অফিস: চট্টগ্রামে একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গভীর সংকটে পড়েছে শ্রমবাজার। গত দুই বছরে অন্তত ১৯০টি কারখানা বন্ধ হওয়ায় ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে অন্তত ৮০টি কারখানায় ৩৭০ বার শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা সামাল দিতে হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের শিল্প খাতে স্থিতিশীলতা ফেরেনি। কাঁচামাল সংকট, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা, ক্রয়াদেশের অভাব এবং আর্থিক অস্থিরতার কারণে ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হচ্ছে বিভিন্ন কারখানা।
সর্বশেষ গত ৩০ জুলাই দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ তাদের ১১টি কারখানা একযোগে বন্ধ ঘোষণা করে। এতে একসঙ্গে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারান।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের তথ্যে দেখা যায়, বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৯০টি কারখানার মধ্যে ১৩১টি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। বাকি ৫৯টি কারখানা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, আর্থিক দুরবস্থা, কাঁচামালের অভাব ও ক্রয়াদেশ না থাকায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই তৈরি পোশাক খাতের বাইরের শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কারখানার পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা কিছু প্রতিষ্ঠানে অর্ডার দিচ্ছে না। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নে জটিলতাও সংকট বাড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম সোনিয়া বলেন, বেতন বকেয়া, হঠাৎ কারখানা বন্ধ, মালিক-শ্রমিক বিরোধ এবং ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের চট্টগ্রাম সমন্বয়কারী ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, চালু থাকা অনেক কারখানাও রুগ্ন অবস্থায় রয়েছে। উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে মালিকপক্ষ।
শিল্প পুলিশের কার্যালয়ের সামনে অভিযোগ জানাতে আসা আগ্রাবাদের আল-আমিন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কর্মী পারভীন আক্তার বলেন, ২১ বছর ধরে কাজ করলেও তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ২০ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। ঈদ বোনাসও দেওয়া হয়নি। শ্রম অধিদপ্তরে অভিযোগ করার পর অফিসে ঢুকতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম চৌধুরী সেলিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্ডার না থাকায় কারখানা প্রায় ১৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের দাবি ন্যায্য এবং পর্যায়ক্রমে পাওনা পরিশোধের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেসব কারখানার মালিকদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো বেশি সংকটে পড়েছে। কিছু কারখানায় দখল-বেদখল ও মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোরশেদ পারভেজ তালুকদার বলেন, অনেক মালিক আত্মগোপনে থাকায় কারখানার ব্যবস্থাপনা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। রপ্তানি আদেশ কমে গেছে, ব্যাংকঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না, নতুন ঋণও মিলছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান এলসি খুলতেও ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের এক-তৃতীয়াংশের মতো নতুন কাজ পেয়েছেন। কেউ ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ হকারি করছেন, কেউ ফুটপাতে ছোট দোকান বসিয়েছেন। তবে বেশি বয়সী অনেক শ্রমিক এখনো কোনো কাজ না পেয়ে ঘরে বসে আছেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত আর্থিক সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, রপ্তানি আদেশ বাড়ানো এবং শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে চট্টগ্রামের শিল্প খাতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সানা/আপ্র/৫/৮/২০২৬