মো. আয়নাল হক, রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কয়েকটি গ্রাম। সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী, সোনাপুর ও গেন্দার আলগা গ্রামের বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র একে একে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মাত্র দুই থেকে তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজার ২০০ পরিবারের ঘরবাড়ি ও জমি নদীর পেটে চলে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নদীভাঙনে সব হারিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫০০ পরিবার চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানো হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একসময় স্বচ্ছলভাবে বসবাস করা এসব পরিবারের অনেকেই এখন ভিটেমাটি হারিয়ে রাস্তার পাশে, অন্যের বাড়ির পেছনে কিংবা পরিত্যক্ত স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিলেও অর্থের অভাবে নতুন করে ঘর তুলতে পারছেন না।
সুখেরবাতি গ্রামের মৃত আহাম্মদ দেওয়ানীর ছেলে আমির হামজা (৬৫) বলেন, “আমার বসতভিটাসহ সাত একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন অন্যের জমিতে কোনোরকমে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছি।”
একই গ্রামের মৃত বাছের আলীর স্ত্রী ছাহের বেওয়া (৬৬) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “যাদের টাকা আছে, তারা জমি বন্ধক নিয়ে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করেছে। আমি তিন ছেলেকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি।”
আল্লাদী বেগম বলেন, “নদীতে ভেসে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে ঘর ভেঙে রাস্তার পাশে এনে রেখেছি। কিন্তু টাকা না থাকায় কোথাও স্থায়ীভাবে ঘর তুলতে পারছি না। এভাবে ঘরের মালামালও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন রশিদ মিয়া, আতোয়ার, আবুল হোসেন, রমজান আলী, রফিকুল ইসলাম, সুরুজ্জামান, সিরাজুল, মজিদ, সুকুমুদ্দিন, ফুলচান, শহর আলী, আয়নাল হক ও বাবুল মিয়াসহ অসংখ্য ভুক্তভোগী।
স্থানীয় বাসিন্দা তোতা মিয়া (৪০) বলেন, “আমাদের এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ ও মাদ্রাসাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা এখন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত ব্রহ্মপুত্র নদের স্থায়ী শাসনের মাধ্যমে ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছাইদুর রহমান দুলাল বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা তৈরি করে উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
রৌমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেসকাতুর রহমান বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সরকারি সহায়তা তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাময়িক সহায়তা নয়, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত স্থায়ী বাঁধ ও নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আরো বহু পরিবার ও গ্রামের অস্তিত্ব মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে।
সানা/আপ্র/৩১/৭/২০২৬