যুক্তরাজ্যের চাকচিক্যময় জীবনের আড়ালে বাড়ছে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির আর্থিক হাহাকার। দেশটির বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অবিশ্বাস্যভাবে ৬৫ শতাংশ ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। শুধু বাংলাদেশি নয়, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পরিবারগুলোর অবস্থাও নাজুক। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শিশুদের এই ‘বস্তুগত বঞ্চনা’ এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশের একটি সংবাদসংস্থার লন্ডন প্রতিনিধি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন।
আগামী মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণের পদ্ধতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ডিপার্টমেন্ট ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনস (ডিডব্লিউপি) এখন থেকে সরাসরি ট্যাক্স রেকর্ড (এইচএমআরসি) ও বেনিফিট পেমেন্টের তথ্যের সমন্বয়ে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডেটাসেট’ ব্যবহার করবে। সরকারের ধারণা, এর ফলে দারিদ্র্যের আনুষ্ঠানিক সংখ্যা কাগজে-কলমে কিছুটা কমলেও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর বিশেষ করে এশীয় মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর ‘অতি গভীর দারিদ্র্যের’ প্রকৃত ও ভয়ংকর চিত্রটি উন্মোচিত হবে।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা অন্য সব কমিউনিটিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ডিগ্রি বা যোগ্যতা শ্রমবাজারে উচ্চ বেতনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। গবেষকরা একে বলছেন ‘ব্রোকেন সোশ্যাল মোবিলিটি প্রমিস’।
শ্রমবাজারে বিদ্যমান ‘জাতিগত বৈষম্য’ (এথনিক পেনাল্টি) এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব বাংলাদেশি পরিবারগুলোকে একটি স্থায়ী দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে ফেলেছে। দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি এমন পরিবারে বাস করেন যেখানে সব সদস্য কর্মসংস্থানে যুক্ত নন।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ পাকিস্তানি পরিবারগুলোর ৫৯ শতাংশ বর্তমানে দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। তবে তাদের জন্য কিছুটা আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের ‘দুই সন্তান পর্যন্ত বেনিফিট’ পাওয়ার সীমা বাতিলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ পরিবারগুলোর তুলনায় পাকিস্তানি পরিবারগুলোর ৪১ শতাংশেরই তিন বা ততোধিক সন্তান রয়েছে। এই নীতি পরিবর্তনের ফলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হাজার হাজার পাকিস্তানি শিশুকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ক্রাইসিস অব বিলঙ্গিং’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ‘গুপ্ত ক্ষুধা’র কথা উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ ব্রিটিশ মুসলিম জরুরি গৃহস্থালি বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। চরম সংকটে থাকলেও লোকলজ্জার ভয়ে ৯৫ শতাংশ মানুষই সরকারি বা দাতব্য সহায়তা নিতে চান না। এই ‘অদৃশ্য দারিদ্র্য’ বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান মুসলিমদের মধ্যে আরো প্রকট।
আগামী মাসে ‘ডিপ মেটেরিয়াল পোভার্টি’ বা গভীর বস্তুগত দারিদ্র্য পরিমাপের নতুন সূচক চালু হতে যাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, কেবল পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে দারিদ্র্যের সংখ্যা কমিয়ে দেখালে মূল সমস্যার সমাধান হবে না। লন্ডন ও ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয় এবং মুসলিম নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা দূর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সানা/আপ্র/২০/২/২০২৬