১০ ওভার শেষে আয়ারল্যান্ডের রান ৪ উইকেটে ৭৯। ১০ ওভার শেষে ওমানের রান ২ উইকেটে ৮৫। ব্যবধানটা স্পষ্টই। তবে এই ম্যাচের গল্পে শুরুর ১০ ওভার থাকবে সামান্যই। পরের সময়টাই যে গড়ে দিয়েছে ম্যাচের ভাগ্য! শুরুতে ধুঁকতে থাকা আইরিশরা পরের ১০ ওভারে তাণ্ডব চালিয়ে এত রান তুলে ফেলল, ওমান পারল না গোটা ইনিংসেও সেই রানকে স্পর্শ করতে!
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের রান আর রেকর্ডের জোয়ারে ভেসে গেল ওমান। কলম্বোতে ৯৬ রানের জয়ে তিন ম্যাচে প্রথম জয়ের স্বাদ পেল আইরিশরা। হ্যাটট্রিক পরাজয়ে এবারের বিশ্বকাপে সবার আগে বিদায় নিশ্চিত হলো ওমানের। কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে শনিবার প্রথম ১০ ওভারে ৭৯ রান তোলা আয়ারল্যান্ড পরের ১০ ওভারে তোলে ১৫৬ রান।
২০ ওভারে ২৩৫ এবারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্কোর। এই সংস্করণে আইরিশদের সর্বোচ্চ স্কোরও। বিপর্যয়ের মধ্যে দলকে এগিয়ে নেয় লর্কান টাকার। ৫১ বলে ৯৪ রানের অপরাজিত ইনিংসে বেশ কয়েকটি রেকর্ড গড়েন আইরিশদের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক।
উদ্ধারপর্বে তার সঙ্গে শতরানের জুটি গড়া গ্যারেথ ডিল্যানি করেন ঝড়ো ফিফটি। শেষদিকের ধ্বংসলীলায় টাকারের সঙ্গী ছিলেন জর্জ ডকরেল। বিশাল রান তাড়ায় ১১ ওভারে শতরানের কাছাকাছি যাওয়া ওমানের ব্যাটিং পরে মুখ থুবড়ে পড়ে। গুটিয়ে যায় তারা স্রেফ ১৪০ রানে। ৪২ রানের মধ্যে হারায় তারা শেষ ৮ উইকেট।
ম্যাচের একটি ঘটনা অবশ্য বিতর্কের খোরাক জোগাতে পারে, যেখানে জড়িয়ে ম্যান অব দা ম্যাচ টাকার। অষ্টম ওভারে বাঁহাতি স্পিনার আমির কালিমের বলে তাকে স্টাম্পিংয়ের আবেদন তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে যায়। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায়, কিপার স্টাম্প ভাঙার সময় টাকার ছিলেন ক্রিজের বাইরে। তবে ডানহাতে বেলস ফেলে দিলেন বল ছিল কিপারের বাঁহাতে। বারবার রিপ্লে দেখে তৃতীয় আম্পায়ারের মনে হয়, বেলস ফেলে দেওয়ার সময় কিপারের বাঁহাতের সংযোগ ছিল না ডানহাতের সঙ্গে। তাতে বেঁচে যান টাকার। ধারাভাষ্যে থাকা ওয়াকার ইউনিস যদিও বলেন, “আমার মনে হয়, তৃতীয় আম্পায়ার এখানে ভুল করেছেন। কিপারের বাঁহাতের সঙ্গে ডানহাতের সংযোগ ছিল।” টাকার তখন ছিলেন ১৫ বলে ১৮ রানে। পরে তিনিই গড়ে দেন মূল পার্থক্য।”
ম্যাচের শুরুটাও ছিল নাটকীয়। প্রথম বলেই ব্যাটের কানায় লেগে বাউন্ডারি পান টিম টেক্টর। তবে বাঁহাতি স্পিনার শাকিল আহমেদকে বারবার স্টাম্প ছেড়ে শট খেলার চেষ্টায় প্রথম ওভারেই বোল্ড হয়ে যান তিনি। আরেক ওপেনার রস অ্যাডায়ার পরের ওভারে টানা তিনটি চার মেরে দেন। কিন্তু এই অ্যাডায়ারকেও ফেরান শাকিল। একাদশে ফেরা এই স্পিনার পাওয়ার প্লের মধ্যে ফিরিয়ে দেন টিমের বড় ভাই হ্যারি টেক্টরকেও। অষ্টম ওভারে আমির কালিমের বলে যখন বিদায় নিলেন কার্টিস ক্যাম্ফার, ৬৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন ধুঁকছে আয়ারল্যান্ড। এক বল পরই সটাম্পিং বিতর্কের সেই ঘটনা। টাকার ও ডিল্যানি শুরু করেন কিছুটা দেখেশুনে। ১০ ওভার শেষে টাকারের রান ছিল ২৩ বলে ২৪, ডিল্যানির ৭ বলে ৮। ম্যাচের প্রথম ছক্কাটি আসে দশম ওভারে ডিল্যানির ব্যাটে। এক বল ছক্কা মারেন টাকারও। ব্যস, খোলস ছেড়ে বেরিয়ে দুজনই স্রেফ তাণ্ডবলীলা চালাতে থাকেন ওভারের পর ওভার।
৩৫ বলে ফিফটি করেন টাকার, ২৮ বলে ডিল্যানি। ফিফটির পর আরেকটি বাউন্ডারি মেরে আউট হয়ে যান ডিল্যানি। জুটি থামে ৫৬ বলে ১০১ রানে। তবে ওমানের বোলারদের নতুন দুঃস্বপ্নের শুরু সেখান থেকেই। টাকার ও ডকরেল যে হ্যারিকেন বইয়ে দেন। মোহাম্মাদ নাদিমের এক ওভারে তিন ছক্কা দুই চারে ২৬ রান নেন টাকার। জিতেন রামানান্দিকে দুটি ছক্কা মারেন ডকরেল। শেষ ওভারটি শুরুর পর টাকারের রান ছিল ৯১। প্রথম বলে দুই রান নেন তিনি, পরের বলে নেন সিঙ্গল।
এরপর আর স্ট্রাইক পাননি। ওভারের তৃতীয় বলে রান নিতে পারেননি ডকরেল। পরের তিন বলে টানা তিন ছক্কায় তিনি শেষ করেন ইনিংস। ৫ ছক্কায় ৯ বলে ৩৫ রান করে অপরাজিত থেকে যান এই অলরাউন্ডার। ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস স্পর্শ করে ৫১ বলে ৯৪ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন টাকার। ২০২৩ সালে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ঠিক ৫১ বলেই অপরাজিত ছিলেন তিনি ৯৪ রানে। পল স্টার্লিং ছিটকে পড়ায় দলকে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বেই গড়ে ফেললেন রেকর্ড। স্টার্লিংয়ের ৯১ রান ছাপিয়ে টি-টোয়েন্টি কোনো আইরিশ অধিনায়কের সর্বোচ্চ ইনিংস এখন টাকারের। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আইরিশ অধিনায়কদের মধ্যে আগের সর্বোচ্চ ছিল অ্যান্ড্রু বালবার্নির ৬২।
টাকার-ডিল্যানি-ডকরেলের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে শেষ ৬ ওভারে আয়ারল্যান্ড তোলে ১১১ রান।
এই বিশাল স্কোর তাড়া করার শক্তি ওমানের ছিল না। প্রথম তিন ওভারে দুটি উইকেট হারিয়ে আরও পিছিয়ে পড়ে তারা। তার পরও লড়াইয়ে আভাস ছিল আমির কালিম ও হাম্মাদ মির্জার ব্যাটে। দ্বিতীয় উইকেটে ৪৯ বলে ৭৩ রানের জুটি গড়েন দুজন। ২৮ বলে ফিফটি করে রেকর্ড বইয়ে নাম লেখান ৪৪ বছর ৮৬ দিন বয়সী কালিম। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সী ফিফটির কীর্তি এটি। আগের রেকর্ডটি ওমানের আগের ম্যাচেই করেছিলেন মোহাম্মাদ নাদিম (৪৩ বছর ১৬১ দিন)।
ফিফটির পরের বলেই আউট হয়ে যান কালিম। এরপর ওমানের ইনিংস ধসে পড়ে তাসের ঘরের মতো। ৩৭ বলে ৪৬ করে রান আউট হন হাম্মাদ। বাকি ব্যাটসম্যানরা ব্যস্ত ছিলেন স্রেফ আসা-যাওয়ায়। ৯৬ রানের জয় বিশ্বকাপে আইরিশদের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়। পরের ম্যাচে বৃহস্পতিবার আয়ারল্যান্ডের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে, পরদিন ওমান নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
আয়ারল্যান্ড : ২০ ওভারে ২৩৫/৫ (টিম টেক্টর ৫, রস অ্যাডায়ার ১৪, হ্যারি টেক্টর ১৪, টাকার ৯৬*, ক্যাম্ফার ১৪, ডিল্যানি ৫৬, ডকলেন ৩৫*; শাকিল ৪-০-৩৩-৩, ফায়সাল ২-০-৩২-২, নাদিম খান ৪-০-৩৪-০, কালিম ৪-০-২৯-১, সুফিয়ান ২-০-৩৫-০, জিতেন ২-০-৩৯-০, মোহাম্মাদ নাদিম ২-০-৩২-০)।
ওমান : ১৮ ওভারে ১৪০ (কালিম ৫০, জাতিন্দার ৭, ওদেদ্রা ১, হাম্মাদ ৪৬, ভিনায়ক ০, মোহাম্মাদ নাদিম ১, জিতেন ৩, নাদিম খান ০, সুফিয়ান ১০, শাকিল ৪, ফায়সাল ৯*; হামফ্রিজ ৪-০-২৭-২, মার্ক অ্যাডায়ার ৩-০-৩৬-০, ম্যাককার্থি ৩-০-৩২-২, ডিল্যানি ২-০-১৩-০, লিটল ৪-০-১৬-৩, হ্যারি টেক্টর ১-০-৯-০, ডকরেল ১-০-৬-১)।
ফল: আয়ারল্যান্ড ৯৬ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: লর্কান টাকার।
ডিসি/আপ্র/১৪/২/২০২৬