ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন উন্নত জীবনমান, নিরাপদ নগরব্যবস্থা, সামাজিক আস্থা এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম সুখী ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে ধারাবাহিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকেও শহরটি শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হ্যাপি সিটি ইনডেক্সে কোপেনহেগেন বিশ্বের সবচেয়ে সুখী শহরের স্বীকৃতি পেয়েছে। পাশাপাশি ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) গ্লোবাল লিভএবিলিটি ইনডেক্সে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন সূচকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ নম্বর পাওয়াই এ সাফল্যের ভিত্তি।
কোপেনহেগেনের অন্যতম শক্তি নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থা। ডেনমার্ক বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিরাপদ দেশগুলোর একটি। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন, অন্যরাও নিয়ম মেনে চলবেন এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করবেন।
এই সামাজিক আস্থার প্রতিফলন দেখা যায় দৈনন্দিন জীবনেও। নিরাপদ পরিবেশের কারণে অনেক অভিভাবক শিশুদের স্ট্রলারে রেখে স্বল্প সময়ের জন্য ক্যাফে বা দোকানে প্রবেশ করেন, যা দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডেনিশ জীবনধারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য। দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকা নয়, বরং পরিবার, অবসর এবং মানসিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর সঙ্গে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা নাগরিকদের জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক করেছে।
বিশ্বের অন্যতম সাইকেলবান্ধব শহর হিসেবেও পরিচিত কোপেনহেগেন। প্রতিদিন হাজারো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন যাতায়াতে সাইকেল ব্যবহার করেন। বৃষ্টি, ঠান্ডা বা তুষারপাতও তাদের এ অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। ফলে পরিবেশ দূষণ কমার পাশাপাশি নাগরিকদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও নিশ্চিত হচ্ছে।
ডেনিশদের সুখী জীবনের অন্যতম দর্শন ‘হুগে’। এ ধারণার মূল কথা হলো জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তে আনন্দ, স্বস্তি ও উষ্ণতা খুঁজে নেওয়া। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, এক কাপ কফি নিয়ে নিরিবিলি সময় উপভোগ করা কিংবা ঘরের আরামদায়ক পরিবেশে থাকা—এসবই তাদের কাছে সুখী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আবহাওয়ার প্রতিও ডেনিশদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। দেশটিতে বছরের বড় একটি সময় ঠান্ডা ও বৃষ্টিপ্রবণ হলেও তাদের জনপ্রিয় প্রবাদ, ‘খারাপ আবহাওয়া বলে কিছু নেই, খারাপ পোশাক আছে।’ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, বরং তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই তাদের জীবনদর্শনের অংশ।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ও কোপেনহেগেনকে আলাদা করেছে। বিশ্বের জনপ্রিয় খেলনা লেগো-র জন্ম ডেনমার্কে। এছাড়া ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত টিভোলি গার্ডেন্স বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিনোদন পার্ক হিসেবে এখনও পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত অবকাঠামো, কার্যকর জনসেবা, সামাজিক আস্থা, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার সমন্বিত মডেলই কোপেনহেগেনকে বিশ্বের অন্যতম সুখী ও বাসযোগ্য শহরে পরিণত করেছে। বিশ্বের অনেক শহর যেখানে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে কোপেনহেগেন দেখিয়েছে—একটি শহরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার নাগরিকরা কতটা নিরাপদ, সুস্থ ও স্বস্তিতে জীবনযাপন করছেন তার ওপর।
এসি/আপ্র/২৫/০৭/২০২৬