আমি দেয়াল হব
অমিয় দাশ
ওরে ওরে ওরে- শোন্ রে মানুষ, শোন্ রে ভাই,
দেয়ালেরও চোখ আছে, মুখ যে তাহার নাই।
রাইতে যখন আঁধার নামে, চাঁদ লুকায় মেঘের ঘোরে,
আমি দেয়াল হইয়া থাকব, নীরব ওই ঘরের দ্বারে।
আমি দেয়াল হব, নীরব পাথর, দাঁড়ায়ে রব রাতের আঁধারে,
এক পরিবারের কান্না শুনব, শেষ আহাজারির হাহাকারে।
ইট-পাথর আর চুন-সুরকিতে গড়ব আমি বুকের ঘর,
মানুষের হাসি-কান্না জমবে, জমবে কত নীরব প্রহর।
মায়ের চোখের সামনে শুনব, সন্তানের শেষ কান্নাখানি,
বাপের বুকের চাপা আর্তি, দেয়াল ছাড়া কেইবা জানি?
আমি দেয়াল হব, ওরে আমি দেয়াল হব,
কথা কইবো না, চোখ বুজবো না, সত্যের সাক্ষী রব।
ওরে ওরে আমি দেয়াল হব রে,
নীরব রাতের গোপন কথা বুকে লিখে রব রে।
চিয়াংশিতে ২৫ দেশের তরুণ নেতাদের আন্তর্জাতিক সংলাপ
আল-বদর, রাজাকারের ঘরেও ইতিহাসের দেয়াল হব,
নকশাল কিংবা মুক্তিযোদ্ধার পালায় থাকা ঘরেও রব।
শরণার্থীর ফেলে যাওয়া শূন্য ঘরের দেয়াল হব,
ধুলোমাখা সেই উঠোনখানার পুরান কথা মনে রাখব।
ছিল হাসি, ছিল আশা, ছিল কত অভিমান,
ভোরের আগে কে যে কাইড়া নিল রে সেই সুখের প্রাণ?
ওরে ওরে ওরে, কোন পথে যায় মানুষ,
মানুষ হইয়া মানুষ যদি হারায় মনের হুঁশ।
ওরে ওরে, আমি দেয়াল হব,
যা দেখেছি বুকের ভেতর চিরকাল তা রাখবো।
সাগর-রুনির ঘরের দেয়াল যদি কথা কইতে পারত,
কে আইলো, আর কে গেল রে, যা দেখেছে সব জানাইত।
নিথর হইয়া দেয়াল থাকে, সময় চলে রাতের স্রোতে,
সত্য যদি লুকায় মানুষ, প্রশ্ন থাকে দেয়ালজুড়ে।
চন্দ্রা ঘোষের দুটি কবিতা
আশা যাওয়া
চুপচাপ... নিঝুম রাত
কিছু অব্যক্ত কথার সুস্পষ্ট আহ্বানে
বারে বারে পিছু ফিরে চাওয়া
কিছু পাওয়া না পাওয়ার হিসেবের ঝুলি
ভরা থাক বা না থাক
মনের টানে ভাটার গাঙ্গে
জিরিয়ে নেওয়া কিছু ক্ষণিকের
ক্ষণ ভীষণ আপন...
পূর্ণিমার রাতে ছায়াপথের
রেখা অস্পষ্ট, ম্রিয়মাণ
তবুও তো সে ছায়াপথই...
আকাশের বুকে এঁকে চলে
তার অগণিত রেখার আলপনা
হারানোর মাঝে খুঁজে পাওয়ার
আকাঙ্ক্ষায় বারে বারে হারায়।
অবুঝ মনের সীমাহীন আশা,
নিরাশার মাঝে ডুবে যায়
গতিময় জীবনের ধারা
চলতে থাকে নিয়মের অনুশাসনে...
কিছু কথা থাক জমা
থাক তোলা কিছু আশা
পরজনমে...
ভবিষ্যৎ কথা কয়
আজ কার মূর্তি ভাঙছো
লেনিন, বিদ্যাসাগর অথবা বীরশ্রেষ্ঠদের?
আরো বহু কিছু ধ্বংস করতে পারো।
তুমি ভাঙতে পারো একটা হাসপাতাল
অথবা অন্য কোনো পঞ্চালিকা।
আদর্শ যাবে না মোছা যত চেষ্টা করো।
পৃথিবীজুড়ে যারা মানুষের সাথী ছিল
ছিল মানুষের সামাজিক প্রতিষ্ঠার প্রতীক
তাদের মূর্তি ভাঙো কোন্ ছলনায় ভুলে?
হৃদয়ে বর্বরতা, লোহার রড নিয়েছো তুলে!
পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ানো কর্বুররা
মুচকি হাসে, সত্য আঁধারে মুখ লুকায়।
নিশাচর প্রাণীদের দাপাদাপি তীব্র হয়।
দিকে দিকে দ্রৌপদীরা তিলোত্তমা হয়ে পড়ে।
সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে
দুর্নীতির মহা অট্টালিকায় ।
একদিন মানুষের চোখের সামনের
পর্দাটা দ্রুত খুলে পড়ে
বজ্রকেতুর শিষ্যদের স্থান হয়
ঘন অন্ধকার কারাগারে।
শেষ দরদাম
কণিকা মাহমুদ
যেই দিন শেষবার তুমি আমার শরমের শেষ বসন খুইল্যা দিলা,
আদিম নেশার কাছে দু’জনেই
উড়াইয়া দিলাম সুখের ঘুড্ডি!
হারা গেরামে রইট্টা গেল আমি বেলাজ, বেহায়া, বেশ্যা
আউক্ষের ছোঁবড়ার মতো যে যত পারে দুই পায়ে মাটির মধ্যে পুঁইত্তা দেয়।
তুই পিট বাঁচাইতে পলাইয়া গেলি
রাইতের আন্ধারে।
পলাইয়া গেল প্রতারক প্রেমিক, তার লগে আমার হাউসের পিরিত!
গেড়াম ছাইড়া শহরে আইলাম নয়া জীবনের আশায়
এইহানে সব অচেনা মুখ, নয়া রাস্তা, নয়া আন্ধার!
বেবাক মানুষ দেখতে মাইনষের মতো ওইলেও স্বভাবে হগোলতে কুত্তার লেহান।
এরাও নাক, মুখ ঘষে মাইয়া মাইনষের গতরে গন্ধ নেওয়ার লাইগ্গা।
এরাও মাইয়া মাইনষের মাংস খাইতে পাগলা কুত্তার মতোন করে।
শকুনের মতোন ছোবল মারে বিষাক্ত নউখের আঁচরে।
এহন আমি শহর চিন্না গেছি
চিন্না গেছি ল্যাম্পপোস্ট, সিগন্যাল, খদ্দের!
রাইতের দরদাম করা শিক্ষা গেছি!
প্রেতেক দিন হাজার অচেনা মাইনষের মধ্যে একটা চেনা মুখ বিচরাই।
হের লগের শেষ দরদাম মিটানোর লাইগ্যা।
হেই মুনুষটা ওই রাইতে আমার হাতটা শক্ত কইরা ধইরা সমাজের মাইনষের সামনে নিজের বইল্যা দাবি করতো, তাইলে...
আইজ আমার একখান ছোটো ছনের ঘর থাকতো, জোছনায় ফক ফক করতো ঘরের আন্ধার, একখান উঠান থাকতো অসমান দেহোনের লাইগ্গা, একখান পুকুর ঘাট থাকতো, আমি দুই পাও ডুবাইয়া সাগরের সুখ লইতাম। অবশ শৈল্যের লাইগ্গা একখান পবিত্র বিছানা থাকত!
এক পুরুষের গতরের লগে কাটাইয়া দিতাম হারা জীবন।
তার লগে শেষ দরদামটা এহোনো
বাকি রইয়্যা গেছে...
কেএমএএ/আপ্র/০২.১০.২০২৬