মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশ মানুষের মস্তিষ্কের কোষ ও জিনগত গঠনে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটায়, তা জানতে গবেষণাগারে তৈরি ক্ষুদ্র মানব মস্তিষ্কের টিস্যু পাঠানো হয়েছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। নাসা ও স্পেসএক্সের যৌথ সরবরাহ অভিযানের অংশ হিসেবে পাঠানো এসব ত্রিমাত্রিক টিস্যু মডেল কয়েক সপ্তাহ কক্ষপথের গবেষণাগারে রাখা হবে। ওজনহীনতা ও মহাজাগতিক বিকিরণের প্রভাব বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে চাঁদ, মঙ্গল ও দূর মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে নভোচারীদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পথ খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণাগারে স্নায়ুকোষ থেকে তৈরি ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের এসব মডেলকে ‘মিব্রেনস’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। এগুলো পূর্ণাঙ্গ মানব মস্তিষ্ক নয়; বরং মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও কোষীয় কার্যক্রম অনুকরণ করে তৈরি ক্ষুদ্র টিস্যু মডেল। এসব নমুনা নিয়ে গবেষণার লক্ষ্য হলো, মহাকাশে স্বল্প সময় অবস্থান করলেও কোষের স্তরে মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা শনাক্ত করা।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে নাসা ও স্পেসএক্সের যৌথ সরবরাহ অভিযান ‘সিআরএস-৩৫’ যাত্রা শুরু করে। পরদিন বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ৩টায় মহাকাশযানটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়। স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুলে প্রায় ২ হাজার ৮৬০ কেজি রসদ ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের সঙ্গে এসব পরীক্ষামূলক নমুনা পাঠানো হয়েছে।
নাসার ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষপথের গবেষণাগারে পাঁচ সপ্তাহ ধরে এসব টিস্যু মডেল পর্যবেক্ষণ করা হবে। মহাকাশে পাঠানো নমুনাগুলোর সঙ্গে পৃথিবীতে একই পরিবেশে সংরক্ষিত অনুরূপ নমুনার তুলনা করে গবেষকেরা পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করবেন। এতে মহাকাশের পরিবেশের প্রভাব এবং পৃথিবীতে স্বাভাবিক অবস্থায় কোষের আচরণের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
ওজনহীনতা ও বিকিরণে মস্তিষ্কের কী পরিবর্তন হয়: মহাকাশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। পেশির ক্ষয়, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন এবং দেহের তরল পদার্থের বণ্টনে তারতম্য এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তরলের বণ্টন বদলে যাওয়ায় নভোচারীদের মুখও কিছুটা ফোলা দেখাতে পারে।
তবে মস্তিষ্কের কোষে এসব পরিবেশগত প্রভাব কীভাবে কাজ করে, তা এখনো গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীর তুলনায় মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব অত্যন্ত কম থাকে। এ অবস্থাকে অণু-মাধ্যাকর্ষণ বা প্রায় ওজনহীন পরিবেশ বলা হয়। পাশাপাশি মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের আয়নীয় বিকিরণের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখবেন, এসব পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কের কোষের কার্যক্রম, জিনের প্রকাশ এবং কোষের পারস্পরিক যোগাযোগে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে এ পরিবর্তনগুলো স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তা বোঝাও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র টিস্যু মডেল ব্যবহারের সুবিধা হলো, মানবদেহে সরাসরি পরীক্ষা না করেও নির্দিষ্ট কোষীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। পৃথিবীতে রাখা একই ধরনের নমুনার সঙ্গে তুলনা করলে মহাকাশের পরিবেশের প্রভাব আলাদা করে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এ ধরনের মডেল মানুষের পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্কের সব জটিল কার্যক্রম অনুকরণ করতে পারে না। ফলে গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
চাঁদ-মঙ্গলে দীর্ঘ অভিযানের প্রস্তুতি: ভবিষ্যতে চাঁদে দীর্ঘ সময় অবস্থান, মঙ্গলগ্রহে যাত্রা কিংবা সৌরজগতের আরো দূরবর্তী অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনায় নভোচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার ফলে সৃষ্ট শারীরিক পরিবর্তন মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। মস্তিষ্কের কোষের ওপর মহাকাশের প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে নভোচারীদের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসাপদ্ধতি উন্নয়নে তা সহায়ক হতে পারে।
বিশেষ করে মহাজাগতিক বিকিরণ ও অণু-মাধ্যাকর্ষণজনিত পরিবর্তন যদি স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে, তবে দীর্ঘ অভিযানের আগে ও পরে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য মূল্যায়নের পদ্ধতি তৈরিতে এ গবেষণা ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বার্ধক্যপ্রক্রিয়া ও বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোষীয় পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও এসব পরীক্ষার ফল ভবিষ্যৎ গবেষণায় কাজে লাগতে পারে। তবে মহাকাশে টিস্যু মডেলে পাওয়া ফলাফল থেকে সরাসরি মানুষের রোগ বা চিকিৎসা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না; সে জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন।
মহাকাশে ফসলের রোগবালাই নিয়েও পরীক্ষা: ‘সিআরএস-৩৫’ অভিযানে মানব মস্তিষ্কের টিস্যু গবেষণার পাশাপাশি মহাকাশে উদ্ভিদের রোগবালাই নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পাঠানো হয়েছে। অণু-মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে ফসলের রোগজীবাণু কত দ্রুত ছড়ায় এবং উদ্ভিদের ওপর তার প্রভাব কতটা মারাত্মক হয়, তা পরীক্ষা করাই এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।
দূর মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে নভোচারীদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে মহাকাশেই ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। মহাকাশে উৎপাদিত উদ্ভিদ খাদ্য ও পুষ্টির উৎস হওয়ার পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ এবং অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থায়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু সীমিত জায়গায় উদ্ভিদ উৎপাদনের পরিবেশে রোগ ছড়িয়ে পড়লে খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই অণু-মাধ্যাকর্ষণে রোগজীবাণু ও উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা ভবিষ্যতের মহাকাশ কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এ গবেষণার মাধ্যমে মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশে উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এসব ফলাফল কাজে লাগিয়ে মহাকাশে চাষের উপযোগী রোগপ্রতিরোধী ফসলের জাত নির্বাচন ও উদ্ভাবনের পথ তৈরি হতে পারে।
নভেম্বরের মাঝামাঝি পৃথিবীতে ফেরার পরিকল্পনা: পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক নমুনাগুলো নিয়ে মহাকাশযানটি নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবীতে ফিরে আসবে। ক্যাপসুলটির ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে সমুদ্রে অবতরণের কথা রয়েছে। এরপর নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে মহাকাশের পরিবেশে কোষ ও উদ্ভিদের পরিবর্তন সম্পর্কে পাওয়া তথ্য মূল্যায়ন করবেন গবেষকেরা।
মানব মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র টিস্যু থেকে শুরু করে মহাকাশে ফসলের রোগবালাই নিয়ে পরীক্ষা—এই দুই ধরনের গবেষণার লক্ষ্যই ভবিষ্যতের দীর্ঘ মহাকাশ অভিযানের ঝুঁকি কমানো। একদিকে নভোচারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অন্যদিকে মহাকাশে খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো—দুই ক্ষেত্রেই এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য দিতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৭/১০/২০২৬