আবু ধাবির জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের প্রথম দিনে রানের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। শুক্রবার দিন শেষে ৮ উইকেটে ৩১৭ রান তুলে মাঠ ছেড়েছে দল। এই মাঠে টেস্টের প্রথম দিনে এটিই সর্বোচ্চ সংগ্রহ। তবে একের পর এক ব্যাটারের ভালো শুরুর পরও বড় ইনিংস খেলতে না পারায় রেকর্ডের আনন্দের সঙ্গে রয়ে গেছে অতৃপ্তি।
এর আগে ২০১০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম দিনে ৩ উইকেটে ৩০৭ রান করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রায় ১৬ বছর পর সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল বাংলাদেশ। কিন্তু কোনো ব্যাটারই তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন কুমার দাসের ব্যাটে সম্ভাবনা জাগলেও কেউ ইনিংস বড় করতে পারেননি।
ধারাভাষ্যকার রমিজ রাজা বলছিলেন, উইকেটে তেমন কিছু নেই, বড় ইনিংস খেলা জরুরি। তখন ৬৫ রানে অপরাজিত ছিলেন সাদমান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শর্ট বলের ফাঁদে পড়ে বিদায় নেন অভিজ্ঞ এই ওপেনার। একই পরিণতি হয় অন্যদেরও। ফলে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।
তীব্র গরমে ম্যাচের শেষ দিকে স্পিনাররা বেশি সুবিধা পেতে পারেন, এমন ভাবনা থেকেই সম্ভবত টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক শান্ত। স্পিন বিভাগ শক্তিশালী করতে প্রায় ১৬ মাস পর একাদশে জায়গা পান সফরসঙ্গী রিজার্ভ হিসেবে থাকা নাঈম হাসান।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের বোলিং আক্রমণে অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। দলটির পাঁচ বিশেষজ্ঞ বোলারের সম্মিলিত টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা মাত্র ১৮ ম্যাচ। তুলনামূলক অনভিজ্ঞ এই আক্রমণের বিপক্ষে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন তানজিদ।
দ্বিতীয় ওভারে মোহাম্মদ সালিমের বলে গ্লান্স করে বাউন্ডারি মেরে শুরু করেন তিনি। এরপর ইয়ামিন আহমাদজাইয়ের বলে পরপর দুটি চার হাঁকান। একই বোলারের বল ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে কভারের ওপর দিয়ে তুলে মারেন ছক্কা। হাশমতউল্লাহ শাহিদির স্পিনেও চারের পর ছক্কা হাঁকিয়ে ছন্দ ধরে রাখেন এই বাঁহাতি ওপেনার।
দশম ওভারেই বাংলাদেশের রান পঞ্চাশ ছাড়ায়। ৪১ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অর্ধশতক পূর্ণ করেন তানজিদ। তবে এর মধ্যেই ব্যক্তিগত পাঁচ রানে জীবন পান সাদমান। এরপর আরো সতর্ক হয়ে ব্যাট চালান ৩১ বছর বয়সী এই ওপেনার।
লাঞ্চের আগেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করার বিরল সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন তানজিদ। কিন্তু মনোযোগ হারিয়ে ইসমাত আলমের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে দূর থেকে ড্রাইভ করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন তিনি। ৮ চার ও ৪ ছক্কায় ৭১ বলে ৮৩ রান করে থামে তাঁর ইনিংস।
১২৪ রানে উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর সাদমানের সঙ্গে দলের হাল ধরেন মুমিনুল। দুজন মিলে ৯০ বলে যোগ করেন ৬০ রান। আট ইনিংস পর অর্ধশতকের দেখা পেয়ে বড় ইনিংসের আশা জাগিয়েছিলেন সাদমান। কিন্তু লাঞ্চের পর সালিমের শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দেন তিনি। ক্যারিয়ারের নবম অর্ধশতকে তাঁর সংগ্রহ ৬৭ রান।
এরপর দ্রুত মানিয়ে নিয়ে ব্যাট চালাতে থাকেন মুমিনুল ও শান্ত। কাইস আহমাদের বলে ছক্কা মেরে যাত্রা শুরু করেন অধিনায়ক। দুই বাঁহাতির ব্যাটে বাংলাদেশের বড় সংগ্রহের সম্ভাবনাও জোরালো হয়ে ওঠে। কিন্তু চা বিরতির আগে চার ওভারের মধ্যে ভেঙে পড়ে সেই আশা।
ইয়ামিনের বলে আলতো ড্রাইভ করতে গিয়ে শর্ট কভারে ক্যাচ দেন ৩৯ রান করা মুমিনুল। এক ওভার পর ইয়র্কারের মতো ডেলিভারিতে ধীর প্রতিক্রিয়ায় বোল্ড হন মুশফিকুর রহিম। শুরু থেকেই কাইসকে সাবলীলভাবে সামলানো শান্তও পরে লেগ স্পিনে বিভ্রান্ত হন। ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে বল জমা পড়ে স্লিপে। মাত্র চার রানের মধ্যে তিন উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
এ অবস্থায় দলকে সামাল দেন লিটন ও মেহেদী হাসান মিরাজ। নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিংয়ে গড়েন ৬২ রানের জুটি। এর আগে তাঁদের তিনটি পঞ্চাশোর্ধ্ব জুটিই শতরানে রূপ নিয়েছিল। এবার সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি তাঁরা। ইসমাত আলমের অফ স্টাম্পের বাইরের বল জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলতে গিয়ে স্টাম্পে টেনে আনেন মিরাজ। ২৪ রান করে ফেরেন তিনি।
অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন লিটন। অস্ট্রেলিয়া সফরে টানা তিনবার শূন্য রানে আউট হওয়া এই স্টাইলিশ ব্যাটার এদিন দারুণ ব্যাটিংয়ে অর্ধশতক তুলে নেন। কিন্তু তিনিও ইনিংস বড় করতে পারেননি। সালিমের শর্ট বল পুল করতে গিয়ে ডিপ ফাইন লেগে ক্যাচ দেন তিনি। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচটি নেন ইয়ামিন। ৪ চারে ৮৯ বলে ৫৩ রান করেন লিটন।
একই ওভারে নিখুঁত ইয়র্কারে হাসান মাহমুদকে বোল্ড করেন সালিম। দিনের শেষ চার ওভারে আর কোনো উইকেট পড়তে দেননি নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলাম। অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ১২ রান নিয়ে দিন শেষ করেন তাঁরা। দ্বিতীয় দিনেও এই দুজন ব্যাটিং চালিয়ে যাবেন।
সব মিলিয়ে আবু ধাবির মাঠে প্রথম দিনে সর্বোচ্চ রান তোলার কৃতিত্ব বাংলাদেশের। তবে ব্যাটারদের একের পর এক সম্ভাবনাময় ইনিংসের অপমৃত্যু না ঘটলে সংগ্রহ আরো বড় হতে পারত। রেকর্ডের দিনেও তাই আক্ষেপ সঙ্গী হয়ে থাকল বাংলাদেশের।
সংক্ষিপ্ত স্কোর (প্রথম দিন শেষে)
বাংলাদেশ: ৮৪ ওভারে ৩১৭/৮। সাদমান ৬৭, তানজিদ ৮৩, মুমিনুল ৩৯, শান্ত ২৯, মুশফিক ০, লিটন ৫৩, মিরাজ ২৪, নাঈম ১১ অপরাজিত, হাসান ২, তাইজুল ৪ অপরাজিত।
আফগানিস্তানের বোলিং: ইয়ামিন ১৬-৩-৬২-২, সালিম ১৯-১-৭০-৩, শাহিদি ৩-০-২৪-০, ইসমাত ১২.৪-৫-২০-২, জিয়া ১৯-১-৭৭-০, কাইস ১৪.২-১-৬০-১।
সানা/আপ্র/১০/১০/২০২৬