গত দুই দশকে আর্জেন্টিনা ফুটবল আর লিওনেল মেসি যেন একে অন্যের পরিপূরক। তাকে ছাড়া আর্জেন্টিনাকে কল্পনা করাও কঠিন। সেই দীর্ঘ বন্ধনের ইতি ঘটতে যাচ্ছে আগামীকাল। দলের প্রাণভোমরার বিদায়ের বেদনার পাশাপাশি নতুন অধ্যায় শুরুর রোমাঞ্চও এখন আর্জেন্টিনা শিবিরে।
আগামীকাল মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নেমে বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন মেসি। এরপর শুরু হবে দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়নদের নতুন যুগ। ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা বুয়েনস আয়ার্সে আলবিসেলেস্তে জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমে অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও তুলে দেবেন নতুন প্রজন্মের হাতে।
মেসির আন্তর্জাতিক বিদায়ী ম্যাচটি দেখতে মনুমেন্তালে উপস্থিত থাকবেন ৮৫ হাজার দর্শক। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো তার বেশ কয়েকজন সতীর্থের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রাও থাকবেন এই বিদায় মুহূর্তের সাক্ষী।
এটি এমন এক খেলোয়াড়ের প্রতীকী নেতৃত্ব হস্তান্তরের উপলক্ষ, যার আন্তর্জাতিক অর্জনের মধ্যে রয়েছে একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা ট্রফি। আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন মেসি। ২০৭ ম্যাচে তার গোল ১২৫টি, অ্যাসিস্ট ৬৮টি।
স্পেনের কাছে নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। আর্জেন্টিনা অধিনায়কের চোখেমুখে ছিল শিরোপা ধরে রাখতে না পারার যন্ত্রণা। এর আড়াই মাস পর আগস্টের শেষ দিনে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
মেসি বলেছিলেন, ‘আমি আমার সবকিছু দিয়েছি; আমার আর কিছু দেওয়ার বাকি নেই। তাছাড়া বেশ কিছু দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসছে, যারা সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।’
২০২৮ সাল পর্যন্ত ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ রয়েছেন মেসি। তবে দুই মাস আগে বাবা হোর্হের মৃত্যুর পর তিনি জানিয়েছিলেন, প্রত্যাশার চেয়েও আগেই হয়তো চিরতরে বুট জোড়া তুলে রাখতে পারেন।
বন্ধুদের পুনর্মিলন
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৯৩তম স্থানে থাকা বেনিনের বিপক্ষে মঙ্গলবারের বিদায়ী ম্যাচে মেসির সঙ্গে থাকবেন ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের সদস্যরা ও তাদের পরিবার।
দোহা বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কারিগর অ্যাঞ্জেল দি মারিয়াও থাকবেন এই বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হতে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া দি মারিয়া নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্বের মশাল তুলে দেওয়ার মুহূর্তটি কাছ থেকে দেখবেন।
নতুন প্রজন্মের কয়েকজন খেলোয়াড়ও থাকবেন দলে। ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো ও লিওনেল ফ্লোরেসের মতো খেলোয়াড়দের মেসির অভিষেকের সময় জন্মই হয়নি। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, দিনটি সবার জন্যই অবিস্মরণীয় হয়ে উঠবে।
মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্ম ইতোমধ্যে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। তবে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার মেসির শূন্যস্থান পূরণ সহজ হবে না। স্কালোনির ভাষায়, ‘সামগ্রিকভাবে, আমরা লিওর রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করব।’
মঙ্গলবার ৩৮ বছর বয়সী সহ-অধিনায়ক নিকোলাস ওতামেন্দিকেও বিদায় জানাবেন স্কালোনি। মেসি ও ওতামেন্দির মতো মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পল ও জিওভানি লো সেলসোকেও কেবল বেনিন ম্যাচের জন্য দলে ডাকা হয়েছে। তাদেরও আর আর্জেন্টিনার হয়ে না খেলার সম্ভাবনাই বেশি।
নেতৃত্বের নতুন প্রজন্ম
মেসির বিদায়ী ম্যাচে অন্তত বেঞ্চ থেকে হলেও থাকবেন ২০২২ বিশ্বকাপের আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। তারাই মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন কাণ্ডারি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ এবং ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ।
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে মেসি যে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে আসছেন, সেটিই এবার উত্তরাধিকারসূত্রে ধারণ করতে যাচ্ছেন সেন্টার-ব্যাক রোমেরো। অধিনায়কত্বের দৌড়ে তার পরেই রয়েছেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও লাউতারো।
আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে মেসির উত্তরসূরিদের ঘিরে নতুন দল গড়ার পথে এগোতে শুরু করেছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর কর্দোবায় বলিভিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই নতুন প্রজন্ম নিজেদের সাফল্যের ক্ষুধার প্রমাণ দিয়েছে।
বলিভিয়াকে ৪-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। তরুণ প্রতিভা নিকো পাস ও হোসে মানুয়েল লোপেসও গোল করেন। এরপর শনিবার মনুমেন্তালে বুরকিনা ফাসোকে ৭-০ গোলে হারিয়ে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখে দলটি। ওই ম্যাচে মাস্তানতুওনো ও জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন।
আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ যখন নতুন রূপ নিতে শুরু করেছে, তখন উঠছে আরেকটি প্রশ্ন—মেসির ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি কে হবেন?
স্কালোনি অবশ্য এ বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘লিওর ম্যাচটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা ১০ নম্বর জার্সি কাউকে দেব না। তারপর দেখা যাবে।’
এসি/আপ্র/০৫/১০/২০২৬