কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দল ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে একসঙ্গে কাজ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে নির্বাচনী সমঝোতা এবং অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা দলগুলোকে জোট ছাড়তে হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর খিলগাঁওয়ের আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এসব আলোচনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে বেলা একটা পর্যন্ত চলা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি মাওলানা আবদুল আউয়াল এবং হেফাজত আমিরের ছেলে মুফতি আইয়ুব বাবুনগরী উপস্থিত ছিলেন।
ঐক্যপ্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
বৈঠক সূত্র জানায়, সাত দলের ঐক্যের কাঠামো, অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনা, অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে একসঙ্গে কাজ করবে। তবে ঐক্যের নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামী এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। এ পরিস্থিতিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে থাকা দলগুলো স্থানীয় নির্বাচনে কীভাবে অংশ নেবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কওমি ঘরানার সাত দলের ঐক্যপ্রক্রিয়া এগিয়ে গেলে নতুন ব্যানারে একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সম্ভব কি না, সে বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাত দল একসঙ্গে অংশ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তাঁরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। সাত দল জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তাঁর দল সেই জোটে থাকবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানও জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচনে সাত দলের একসঙ্গে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বরের বৈঠকে এ বিষয়ে আরও আলোচনা হবে। এর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও চলতে পারে।
অন্য জোট ছাড়ার শর্তে মতভেদ
সাত দলের ঐক্যপ্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা নিয়ে। বৈঠকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সাত দলের কোনোটি অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে না। তবে এ শর্তে সব দলের সম্মতি মেলেনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, সাতদলীয় ঐক্যে থাকা কোনো দল অন্য জোটে থাকতে পারবে না-এমন বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। অন্য জোটে থাকা দলগুলোকে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহারও জানিয়েছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য থেকে কওমি ঘরানার দলগুলোকে বেরিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন হেফাজত নেতারা। তবে তাঁর দল ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে কাজ করার পাশাপাশি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১১-দলীয় ঐক্যের আন্দোলনেও অংশ নেবে।
হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ বলেন, সাত দল অন্য কোনো জোটে থাকতে পারবে না-এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কোনো কোনো দল বিষয়টি নিয়ে নিজেদের দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির সঙ্গে দলগুলোর সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব জানিয়েছেন, সাত দলের এই ঐক্য হলে তাঁরা বিএনপির জোট থেকে বেরিয়ে যাবেন।
রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটিতে আলোচনা ও ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। অন্য জোটে থাকা নিয়ে শর্ত শিথিল করা যায় কি না, সে বিষয়েও পরবর্তী সময়ে আলোচনা হতে পারে।
নেতাদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
বৈঠক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এক নেতা দলটির আমির মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা ও বই প্রকাশের বিষয়টি উত্থাপন করেন। এ সময় হেফাজতের মহাসচিব এ ধরনের ঘটনা ও কাজের নিন্দা জানান।
এ ছাড়া হেফাজত নেতা হারুন আজিজীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতাদের নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যসংবলিত পোস্টের বিষয়টিও বৈঠকে তোলা হয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় হেফাজত আমিরের ছেলে মুফতি আইয়ুব বাবুনগরীকে।
বৈঠকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সাম্প্রতিক দুর্গাপূজার সময় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য নিয়েও আলোচনা ও সমালোচনা হয়।
আগামী ৫ ডিসেম্বরের বৈঠকে সাত দলের ঐক্যের নীতিমালা, কর্মপদ্ধতি, নির্বাচনী সমঝোতা এবং অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা নিয়ে মতপার্থক্য নিরসনের বিষয়ে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সানা/আপ্র/২২/১০/২০২৬