সড়কে নিরাপদে চলাচল মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকে, স্বজন হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। দুর্ঘটনা কমাতে নানা উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ, আইন প্রণয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হলেও সড়কে প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় আজ ২২ অক্টোবর পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ’।
দিবসটির মূল প্রত্যাশা শুধু সচেতনতা সৃষ্টি নয়, বরং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা। এ জন্য প্রয়োজন ঘোষিত পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন, আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জবাবদিহি।
সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৮ জন শিশু ও ৯৬২ জন নারী। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২ হাজার ৬৭১ জনের, আর পথচারী নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৬৪ জন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যানেও উদ্বেগের চিত্র রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪ হাজার ২৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আগের বছরের একই সময়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩১৮। অর্থাৎ দুর্ঘটনা সামান্য কমলেও নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার ১৫০ থেকে বেড়ে ৪ হাজার ১৫৭ হয়েছে। আহতের সংখ্যা ৫ হাজার ২৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৯১-এ। এ হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনা কমলেও প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালে প্রকাশিত বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়েছে। তবে এটি সংস্থাটির বিভিন্ন তথ্য ও মডেলভিত্তিক অনুমান; একই বছরের সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪। হিসাবের এই বড় ব্যবধান দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিরূপণে তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যানের সমন্বয় কতটা জরুরি, তা সামনে আনে।
আইন ও পরিকল্পনায় নতুন উদ্যোগ
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে সরকার ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা, দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিকে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট এবং বারবার আইন ভাঙলে দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়াটিতে ১৫টি অধ্যায়, ১১১টি ধারা ও দুটি তফসিল রয়েছে। এটি চূড়ান্ত অনুমোদন ও আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিয়ন্ত্রিত গতি, দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতি’ অনুসারে এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে ১৪০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে নিরাপত্তা উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং প্রায় ৬০০ কিলোমিটার মহাসড়কে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ৬০ হাজার পেশাদার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি পেশাদার চালকদের স্বাস্থ্য ও চক্ষু পরীক্ষা, মাদক পরীক্ষা, সড়কের সংকেত ও সড়কচিহ্ন সংস্কার এবং দক্ষতার ভিত্তিতে চালকদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগ রয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করা, জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং ম্যারাথন আয়োজনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে ৪০টি প্রাথমিক জীবনরক্ষাকারী অ্যাম্বুলেন্স ও ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ, দুর্ঘটনা শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের নির্দেশিকা এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে গতি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা প্রণয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগের সুফল পেতে শুধু নির্দেশনা তৈরি করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্ঘটনা কমাতে চাই জবাবদিহি
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অদক্ষতা ও ক্লান্তি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক কারণ কাজ করে। কোথাও সড়কের নকশাগত ত্রুটি, কোথাও অপর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যাল, আবার কোথাও ফুটপাত দখল ও অনিরাপদ পারাপার মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যানবাহনের ফিটনেস, চালকের দক্ষতা, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাও জরুরি। একই সঙ্গে পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপারের ব্যবস্থা, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে সংশোধন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দুর্ঘটনার পর তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কোন সড়কে কেন দুর্ঘটনা ঘটছে, কোন ধরনের যানবাহন বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে এবং গৃহীত উদ্যোগে প্রাণহানি কতটা কমছে-এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা এবং দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণও জরুরি।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের তাৎপর্য এখানেই যে, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়। পরিবহন মালিক, শ্রমিক, চালক, যাত্রী ও পথচারী-সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। চালকদের ট্রাফিক আইন মানতে হবে, যাত্রীদের চলন্ত গাড়িতে ওঠানামা থেকে বিরত থাকতে হবে, মোটরসাইকেলে চালক ও আরোহী উভয়কেই মানসম্মত হেলমেট পরতে হবে এবং পথচারীদের নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
তবে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিকল্প নেই। সড়ক নিরাপত্তাকে এক দিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরের অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং ফলাফল মূল্যায়নের ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই দিবসটির অঙ্গীকার অর্থবহ হবে। মানুষের যাতায়াত যেন মৃত্যুঝুঁকিতে পরিণত না হয়, সড়ক নিরাপত্তার সব উদ্যোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে হবে সেটিই।
সানা/আপ্র/২২/১০/২০২৬