সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের মতো ঘটনা মানুষের শরীর ও মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। শারীরিক আঘাত অনেক সময় সহজেই চোখে পড়ে, কিন্তু মানসিক আঘাতের প্রভাব সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি, উদ্বেগ, দুঃস্বপ্ন কিংবা ঘুমের সমস্যার মধ্য দিয়ে সেই আঘাত দীর্ঘদিন মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।
আজ ১৭ অক্টোবর, বিশ্ব ট্রমা দিবস। দুর্ঘটনা ও সহিংসতায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ট্রমা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দিনটি পালিত হয়। শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার গুরুত্বও এ দিবসের অন্যতম বার্তা।
কবে থেকে বিশ্ব ট্রমা দিবস?
প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রথম বিশ্ব ট্রমা দিবস পালিত হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও গুরুতর আঘাত কমানো এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। এরপর থেকে প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন করা হয়।
ট্রমা কী এবং কেন হয়?
ট্রমা বলতে সাধারণত শারীরিক ও মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা বোঝানো হয়। সড়ক দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া কিংবা সহিংসতার কারণে শরীরে গুরুতর ক্ষতি হলে তাকে শারীরিক ট্রমা বলা হয়। এ ধরনের আঘাতের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে জটিলতা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ভয়াবহ দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা কাছের কারও আকস্মিক মৃত্যু প্রত্যক্ষ করার মতো অভিজ্ঞতা মানসিক ট্রমার কারণ হতে পারে। তবে কঠিন কোনো ঘটনার মুখোমুখি হলেই যে সবাই দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যায় ভুগবেন, এমন নয়। মানুষের অভিজ্ঞতা, পরিস্থিতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
মানসিক ট্রমার লক্ষণ কী?
ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কারও ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই অস্বস্তি কমে আসে, আবার কারও ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়।
মানসিক ট্রমার সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বারবার ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি ফিরে আসা।
- দুঃস্বপ্ন দেখা এবং ঘুমের সমস্যা হওয়া।
- অতিরিক্ত ভয়, উদ্বেগ কিংবা অস্থিরতা অনুভব করা।
- খিটখিটে মেজাজ, অপরাধবোধ বা অসহায়ত্ব তৈরি হওয়া।
- অন্যদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
- ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয় এমন স্থান বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা।
- কাজে, পড়াশোনায় কিংবা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া।
এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
শারীরিক ট্রমায় কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
দুর্ঘটনা বা গুরুতর আঘাতের পর অতিরিক্ত রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অচেতন হয়ে যাওয়া, তীব্র ব্যথা কিংবা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। বাইরে থেকে ক্ষত ছোট মনে হলেও শরীরের ভেতরে গুরুতর ক্ষতি থাকতে পারে। তাই আঘাতের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।
ট্রমা কাটিয়ে উঠতে করণীয়
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁকে দোষারোপ না করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, বন্ধু কিংবা বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহযোগিতা মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারে।
সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা নেওয়া উচিত। আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত সমস্যা বা পিটিএসডিসহ ট্রমাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যার কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোচিকিৎসা ও অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়তা করা সম্ভব।
বিশ্ব ট্রমা দিবসের মূল বার্তা হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। কারণ, সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য শরীরের ক্ষত সারানোর পাশাপাশি মনের আঘাতকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট, টাইস ম্যাগাজিন ও টাইমস অব ইন্ডিয়া
এসি/আপ্র/১৭/১০/২০২৬