শরীরের অতিরিক্ত চর্বি স্থূলতা ও নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু তাই বলে শরীর থেকে যতটা সম্ভব মেদ ঝরিয়ে ফেলাই সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি নয়। হরমোন তৈরি, শক্তি সঞ্চয়, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সচল রাখতে শরীরের নির্দিষ্ট পরিমাণ চর্বি প্রয়োজন। তাই পেশিবহুল শরীর গড়তে গিয়ে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সৌন্দর্যচর্চার প্রভাবে অতিরিক্ত মেদ কমানোর চেষ্টা উল্টো স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরীরের অতিরিক্ত চর্বি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় চর্বি খুব কমে গেলেও শারীরবৃত্তীয় নানা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তঃস্রাবতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলিফ ওরাল বলেছেন, শরীরের গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক কাজ পরিচালনায় চর্বির ভূমিকা রয়েছে।
শরীরে চর্বি কেন প্রয়োজন: শরীরের চর্বি মূলত দুই ধরনের- খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করা চর্বি এবং শরীরে সঞ্চিত চর্বি। খাবার হজমের পর শরীর তা থেকে শক্তি পায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করা হলে অ্যাডিপোসাইট নামের বিশেষ কোষে তা জমা থাকে। তবে চর্বি শুধু শক্তি সঞ্চয়ের ভান্ডার নয়; এটি সক্রিয় অঙ্গের মতো শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণ করে।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল ফ্যাট টিস্যু গবেষণার অধ্যাপক মিকেল রাইডেনের মতে, শরীরের চর্বিকে বিশেষায়িত শক্তির ভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা যায়। শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি থাকলে এটি পুষ্টি উপাদান জমিয়ে রাখে এবং প্রয়োজনের সময় তা সরবরাহ করে।
চর্বি কোষ থেকে বিভিন্ন হরমোনও তৈরি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লেপটিন। এই হরমোন মস্তিষ্ককে শরীরে সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ সম্পর্কে সংকেত দেয়। ফলে প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। অধ্যাপক এলিফ ওরালের ভাষ্য, লেপটিনের ঘাটতি দেখা দিলে শরীরের অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও চর্বির ভূমিকা রয়েছে। শ্বেত চর্বি অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয়ের পাশাপাশি শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশ উষ্ণ রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, বাদামি ও বেইজ চর্বির বিশেষ কোষ শক্তি পুড়িয়ে তাপ উৎপন্ন করে। এতে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সুবিধা হয়।
মেদ অতিরিক্ত কমলে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি: শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমলে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসার ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে বিপরীতভাবে, শরীরে চর্বির পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে কমে গেলেও গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপাকীয় রোগবিষয়ক গবেষক জেসিকা মাউং বলেছেন, অতিরিক্ত ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের ফলে শরীরের চর্বি বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে স্বাস্থ্য ও শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। শরীরে চর্বিযুক্ত টিস্যু খুব কম থাকলে বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও শারীরিক সক্ষমতা ব্যাহত হয়।
শরীরে সঞ্চিত শক্তি কমে গেলে শক্তি বাঁচানোর প্রবণতা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খেলে শরীর শক্তির জন্য পেশি ভাঙতে শুরু করতে পারে। হাড় গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত হাড়ের পুনরুদ্ধারপ্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপাকীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রেডরিক কার্পে বলেছেন, এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে। গুরুতর সংক্রমণ বা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি না থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।
অতিরিক্ত চর্বিহীনতা হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। চরম মাত্রায় খাবার কমিয়ে দেওয়া পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এতে শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। আবার শরীরে খুব কম চর্বি রয়েছে, এমন অনেক নারী ক্রীড়াবিদের ঋতুস্রাব অনিয়মিত হয়ে যায় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়স বা বার্ধক্যে গুরুতর অসুস্থতার সময় শরীরে কিছুটা অতিরিক্ত ওজন থাকা বেঁচে থাকার সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি হলেও একই রোগে আক্রান্ত কম ওজনের ব্যক্তিদের তুলনায় তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি কিছু ক্ষেত্রে কম দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ প্রবণতাকে ‘স্থূলতা বৈপরীত্য’ বলা হয়। তবে এর অর্থ অতিরিক্ত মেদ স্বাস্থ্যকর নয়। অধ্যাপক এলিফ ওরালের মতে, শরীরে চর্বির একটি সুরক্ষামূলক স্তর গুরুতর হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও অন্যান্য তীব্র অসুস্থতা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
চরম মাত্রায় চর্বি কমে যাওয়া প্রাণঘাতীও হতে পারে। যেমন, অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভুগলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।
শরীরে কতটুকু চর্বি থাকা স্বাভাবিক: শরীরে চর্বির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণের কোনো একক সর্বজনীন মানদণ্ড নেই। বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক গঠন ও কর্মক্ষমতার ওপর প্রয়োজনীয় চর্বির পরিমাণ নির্ভর করে। তবে সাধারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের শরীরে সাধারণত ১০ থেকে ২০ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ থেকে ২৯ শতাংশ চর্বি স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয়। স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে চর্বির পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি হতে পারে। ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে সাধারণত চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটের ওয়েন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া সক্ষমতাবিষয়ক গবেষক তামারা হিউ-বাটলার ও তাঁর সহকর্মীরা ডেক্সা স্ক্যানারের মাধ্যমে ৭০০ জনের বেশি ক্রীড়াবিদের শরীর পরীক্ষা করেন। তাঁদের গবেষণায় পুরুষ ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ এবং নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে ১৬ শতাংশ চর্বি পাওয়া যায়।
তবে শরীরে মোট চর্বির পরিমাণের পাশাপাশি কোথায় চর্বি জমছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পেটের ভেতরে জমা চর্বিকে ভিসেরাল ফ্যাট বলা হয়। এই চর্বি অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর চারপাশে জমে এবং প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ বাড়তে পারে, ইনসুলিনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
শরীরের মেদ মাপার উপায়: শরীরে চর্বির পরিমাণ নির্ণয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে ডেক্সা পূর্ণদেহ স্ক্যানের মাধ্যমে চর্বি, চর্বিবিহীন পেশি এবং হাড়ের ভর সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়। তবে এ পরীক্ষার জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি প্রয়োজন এবং এটি ব্যয়বহুল।
বাড়িতে ব্যবহারের জন্য ত্বকের নিচের চর্বি মাপার একটি পদ্ধতি হলো স্কিনফোল্ড পরীক্ষা। বিশেষ ক্যালিপার দিয়ে ত্বকের নির্দিষ্ট অংশের চর্বির পুরুত্ব মাপা হয়। তবে এতে শরীরের সব অংশের চর্বি সম্পর্কে জানা যায় না এবং পেটের ভেতরের চর্বিও সরাসরি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। পদ্ধতিটি সব সময় নির্ভুল ফল দেয় না।
স্মার্ট স্কেল বা ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রও শরীরে মৃদু বৈদ্যুতিক প্রবাহ পাঠিয়ে চর্বির পরিমাণ অনুমান করে। শরীরে পানির পরিমাণের পরিবর্তনে ফলাফল বদলে যেতে পারে। এসব যন্ত্র শরীরের কোথায় চর্বি জমেছে, তা-ও নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে পারে না।
শরীরের মেদ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে কোমর ও উচ্চতার অনুপাত এবং কোমর ও নিতম্বের অনুপাত ব্যবহার করা যায়। কোমরের মাপকে উচ্চতা দিয়ে ভাগ করে কোমর ও উচ্চতার অনুপাত বের করা হয়। সাধারণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, এ অনুপাত ০.৪ থেকে ০.৪৯-এর মধ্যে থাকাকে স্বাস্থ্যকর সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোমর ও নিতম্বের অনুপাত নির্ণয় করতে নাভি বরাবর কোমরের পরিধিকে নিতম্বের সবচেয়ে প্রশস্ত অংশের পরিধি দিয়ে ভাগ করতে হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে ০.৯০ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ০.৮৫-এর বেশি অনুপাতকে উচ্চ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোমর বা পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের অবনতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
অন্যদিকে, বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই দিয়ে শরীরের চর্বির পরিমাণ নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায় না। কারণ, এ সূচক চর্বি ও পেশির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। ফলে পেশিবহুল, কম চর্বিযুক্ত ব্যক্তিরও বিএমআই বেশি হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের গঠন সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। এ সময় শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়তে পারে এবং পেশি ও হাড়ের ভর কমতে পারে। তাই সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম ও শক্তিবর্ধক প্রশিক্ষণ সুস্বাস্থ্য ধরে রাখতে সহায়ক।
সব মিলিয়ে, শরীরের চর্বিকে কেবল শত্রু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত মেদ কমানো যেমন প্রয়োজন হতে পারে, তেমনি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় চর্বি ধরে রাখাও জরুরি। তাই চরম মাত্রায় মেদ কমানোর মোহে না ছুটে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
অধ্যাপক এলিফ ওরালের ভাষায়, “আমরা বিশ্বাস করি, চর্বি একই সঙ্গে শক্তিশালী ও সুন্দর।” সূত্র: বিবিসি
সানা/ডিসি/আপ্র/১১/১০/২০২৬