জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত হওয়ার অভিযোগে করা একটি মামলার তদন্তে বাদীর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে শিক্ষক-কর্মচারীসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়েছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার আদালতে মামলাটি করেন জাফর আহমেদ। এতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক আকরামুজ্জামান মামলাটি তদন্ত করেন।
তিনি বলেন, “এটা আসলে জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার মামলা ছিল না। বাদী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। তদন্ত করতে গিয়ে তা উঠে এসেছে।”
তদন্ত কর্মকর্তা আরো বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করেই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
মামলার পরবর্তী শুনানির দিন আগামী ২ নভেম্বর ধার্য করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন।
মামলার অভিযোগ ও বাদীর বক্তব্য
জাফর আহমেদ মামলায় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেন। ওই সময় পুলিশের গাড়ির ধাক্কায় তিনি পড়ে গেলে তাঁর ওপর আবার হামলা করা হয়। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নিজের জ্ঞান ফেরে বলে এজাহারে উল্লেখ করেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরদিন ৬ আগস্ট তাঁর বাম পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়।
জাফর আহমেদ বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার বিষয়ে তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে চিকিৎসাসংক্রান্ত সব নথি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, আসামিদের কয়েকজন ঘটনার সময় শুক্রাবাদ ও মোহাম্মদপুরে ছিলেন, বাকিরা শিবচর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করতেন। আসামিরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলেও অভিযোগ করেন তিনি। গত ডিসেম্বরেও জুলফিকার আলীসহ কয়েকজন তাঁর ওপর হামলা করেছিলেন বলে দাবি করেন জাফর। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
আসামিদের বক্তব্য
মামলার চার নম্বর আসামি হেলাল উদ্দিন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার রাজার চর এলাকার আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক। মাদ্রাসাটি জাফর আহমেদের বাবা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
হেলাল উদ্দিন বলেন, মাদ্রাসাটির পরিচালকের দায়িত্বে এখন জাফরের বড় ভাই রয়েছেন। জাফরও একসময় পরিচালক ছিলেন, তবে বিভিন্ন কারণে তাঁকে সরে যেতে হয়। তাঁর অভিযোগ, জাফর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও একাধিকবার সাধারণ ডায়েরি ও মামলা করেছেন।
হেলাল দাবি করেন, মামলায় যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। ঘটনার দিন তাঁরা মাদ্রাসায় ছিলেন। জাফর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর দুইবার হুইলচেয়ারে করে মাদ্রাসায় এসেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর তাঁরা জাফরকে হুইলচেয়ারসহ মাদ্রাসার দোতলায় তুলে দিয়েছিলেন। এ-সংক্রান্ত নথি রয়েছে বলেও দাবি করেন হেলাল।
মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাফর আহমেদের বাবা আব্দুছ ছামাদ ১৯৭০ সালে আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর পর মা আমিরুন নেছা বড় ছেলে শামসুল হককে মাদ্রাসার মোতাওয়াল্লি ও পরিচালনার দায়িত্ব দেন। সহায়তার জন্য জাফর আহমেদকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে মাদ্রাসায় একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কয়েকজন শিক্ষকের সহায়তায় বড় ভাইকে সরিয়ে নিজেকে মোতাওয়াল্লি ঘোষণা করেন জাফর। তাঁর কর্তৃত্বের কারণে প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সংকট ও বিশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে আমিরুন নেছা বড় ছেলে শামসুল হককে আবার মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব দেন।
জাফরকে দায়িত্ব থেকে সরানোর পর মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও ইলমির দায়িত্বে থাকা জুলফিকার আলী ভুট্টো, হেলাল উদ্দিন, আব্দুল্লাহ শাহীন ও আব্দুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিরোধ শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও মানহানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করেন জাফর। তবে আদালত সেই মামলা খারিজ করে দেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এরপর জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার অভিযোগে মাদ্রাসার শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় লোকজনের বিরুদ্ধে বর্তমান মামলাটি করেন তিনি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন আসামিরা ঢাকায় ছিলেন না।
তদন্তে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাফর আহমেদ মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে শিশুদের কোরআন শিক্ষা দিতেন। ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই ভোর পৌনে ৬টার দিকে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তিনি। সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে বিজয় সরণির মোড়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েন। পরে মামলার সাক্ষী আবদুর রহমান খানকে ফোন করে মোটরসাইকেলটি বাসায় পৌঁছে দিতে বলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন রাত ১২টার দিকে জাফর বাংলাদেশ স্পাইন অ্যান্ড অর্থোপেডিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে ৬ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত লালমাটিয়ার সিটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তা হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে বলেছেন, এজাহারে বর্ণিত মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে জুলাই আন্দোলনের সময় মারধরে আহত হওয়ার তথ্যের সঙ্গে চিকিৎসার নথির মিল পাওয়া যায়নি। বরং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদদের গেজেট পর্যালোচনা করেও জাফরের আহত হওয়ার তথ্য মেলেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে শিক্ষক-কর্মচারীদের ফাঁসাতে প্রকৃত ঘটনা গোপন করে মামলাটি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বাদীর অভিযোগ ও আসামিদের বক্তব্যের পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদনই এখন আদালতের বিবেচনাধীন।
সানা/আপ্র/২৩/১০/২০২৬