ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অমীমাংসিত কয়েকটি বিষয় সমাধান হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তাঁর মতে, এই চুক্তি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান উত্তেজনা কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম নেটওয়ার্ক ১৮-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রুবিও এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) তিনি জানান, চুক্তি চূড়ান্ত করতে অল্প কয়েকটি বিষয় এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। দ্রুত সেগুলোর সমাধান করে চুক্তি সইয়ের পথে এগোনোর আশা করছেন তাঁরা।
ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ভারতের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান কিছু উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করতে পারে।”
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সরাসরি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে না। তবে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “আমার সমপদস্থ কর্মকর্তা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং আমি এ বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব দিই। আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছি।”
তিনি আরো বলেন, চুক্তি চূড়ান্ত করতে অল্প কয়েকটি বিষয় বাকি আছে। সেগুলো দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিগগিরই সুখবর ঘোষণা এবং এরপর চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনাও তুলে ধরেন তিনি।
পাঁচ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার ভারত সফরে গেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মঙ্গলবার দুপুরে মুম্বাইয়ে পৌঁছে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীসের সঙ্গে স্ত্রীসহ গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া পরিদর্শন করেন তিনি। পরে ঐতিহাসিক তাজমহল প্যালেস হোটেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক করেন রুবিও।
বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা অংশীদারি এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া জোরদার করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর কয়েক দিন আগে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গয়াল জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রথম পর্যায়ের আইনি খসড়া তৈরির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর পরই রুবিওর বক্তব্য সামনে এলো।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনার পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে নির্দিষ্ট কিছু ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন শিল্পপণ্য ও নির্বাচিত কৃষিপণ্যের ওপর ভারতের শুল্ক কমানোর প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করে। এতে শুল্ক হ্রাস, বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য বাধা দূর করার পদক্ষেপের কথা রয়েছে।
তবে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কে জটিলতা বাড়ে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দেশের কৌশলগত স্বার্থ ও উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। অন্যদিকে, বৈঠক শেষে ভারতের বহুমুখী জ্বালানি আমদানি নীতির প্রশংসা করেন রুবিও।
তিনি বলেন, “ভারত যে তাদের জ্বালানি-উৎসের বৈচিত্র বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, তা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ। রাতারাতি এই পরিবর্তন সম্ভব না হলেও এ বিষয়ে ভারতের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখে আমরা আনন্দিত।”
এর আগে রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রুবিওর ভারত সফর এবং বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ওয়াশিংটনের কাছে নয়াদিল্লির ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সানা/আপ্র/২১/১০/২০২৬