গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

সড়কে অপরাধীদের দাপট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায়?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৪:৩২ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৫:২৬ এএম ২০২৬
সড়কে অপরাধীদের দাপট, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায়?
ছবি

ফাইল ছবি

রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া। অথচ দেশের বিভিন্ন সড়কে ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অনিরাপদ করে তুলছে। কক্সবাজারের ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে দিনের আলোয় ৫০ থেকে ৬০টি যানবাহনের শতাধিক যাত্রীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে লুটপাটের ঘটনা এই বাস্তবতারই ভয়াবহ উদাহরণ। প্রশ্ন হলো, জনপথে অপরাধীদের এমন দাপট কেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও নজরদারির পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না কেন? এভাবে কি একটি রাষ্ট্র চলতে পারে?

সমস্যাটি কোনো একটি সড়ক বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সংবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রবাসীদের লক্ষ্য করে ডাকাতি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার-নবীনগর এলাকায় ছিনতাই ও সশস্ত্র অপরাধ এবং গাজীপুরের শ্রীপুরে অর্থবাহী গাড়ি থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা লুটের ঘটনা উঠে এসেছে। সাভারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ২৬ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় একাধিক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় অপরাধের ধরন, লক্ষ্যবস্তু ও কৌশলের ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: অপরাধীরা সুযোগ বুঝে সংগঠিতভাবে হামলা চালাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

অপরাধীদের এই দুঃসাহসের উৎস অনুসন্ধান করা জরুরি। দুর্বল গোয়েন্দা নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত টহলের অভাব, অপরাধের দ্রুত তদন্ত না হওয়া, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার সম্ভাবনা-সবই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে অপরাধীদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। তবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা নয়, বরং তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রথম প্রয়োজন সড়কভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন। কোন এলাকায়, কোন সময়ে এবং কী কৌশলে অপরাধ বেশি ঘটছে, তার সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। সেই অনুযায়ী নিয়মিত ও আকস্মিক টহল, দ্রুত সাড়াদানকারী দল, কার্যকর তল্লাশিচৌকি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। মহাসড়ক পুলিশ, জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা জরুরি। এক অঞ্চলের অপরাধী অন্য অঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে যেন সহজে আত্মগোপন করতে না পারে, সে জন্য আন্তজেলা সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, গ্রেফতারসংখ্যা বা অভিযানের ঘোষণা দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করা চলবে না। মামলা নিষ্পত্তি, অপরাধে পুনরাবৃত্তি, লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধার এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা-এসব সূচকে অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণে হয়রানি বন্ধ, সাক্ষী ও তথ্যদাতার সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে পরিচয়েরই হোন, তদন্ত ও বিচারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

সরকারি পরিসংখ্যানে কোনো অপরাধের মামলা কমে আসা ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু কিছু এলাকায় প্রকাশ্য ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির পুনরাবৃত্তি থাকলে শুধু সামগ্রিক পরিসংখ্যান দিয়ে জননিরাপত্তার সাফল্য প্রমাণ করা যায় না। অপরাধের প্রকৃত চিত্র, মামলা না করার প্রবণতা এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

নাগরিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, মৌলিক দায়িত্ব। মানুষ সড়কে বেরিয়ে নিরাপদে গন্তব্যে ফিরবে-এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা চলতে থাকলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখন প্রয়োজন আশ্বাসের বদলে কার্যকর পদক্ষেপ, সাময়িক অভিযানের বদলে ধারাবাহিক প্রতিরোধ এবং দায় এড়ানোর বদলে দৃশ্যমান জবাবদিহি। রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্রধারী অপরাধীর দাপটে নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায় প্রমাণিত হয়।
সানা/আপ্র/২১/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ঋণের ফাঁদে বিপন্ন জনজীবন
২০ অক্টোবর ২০২৬

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ঋণের ফাঁদে বিপন্ন জনজীবন

পরিবারের আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো মানুষের মৌলিক আর্থিক নিরাপত্তার শর্ত। অথচ দেশের ৪৭ দশমিক ৪২...

মানুষ অবকাশে যাবে, মৃত্যুফাঁদে নয়: নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক
১৯ অক্টোবর ২০২৬

মানুষ অবকাশে যাবে, মৃত্যুফাঁদে নয়: নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

মানুষ অবকাশকেন্দ্রে যায় নিরাপদে ভ্রমণ, পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দময় সময় কাটানো এবং কর্মব্যস্ত জীবনের ক্...

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দৃঢ় নিশ্চয়তাই হোক সম্প্রীতিময় রাষ্ট্রের ভিত্তি
১৮ অক্টোবর ২০২৬

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দৃঢ় নিশ্চয়তাই হোক সম্প্রীতিময় রাষ্ট্রের ভিত্তি

শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বহুত্ববাদী সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনু...

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়
১৭ অক্টোবর ২০২৬

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়

যে বয়সে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে, যে সময়ে ভবিষ্যতের সুস্থ, কর্মক্ষম ও মেধাবী না...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই