একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডারে নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। নাগরিকের নিরাপত্তা, সম্পদের সুরক্ষা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার যখন আইনের বদলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে।
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাতের আঁধারে হামলা, নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে ভাঙচুর ও লুটপাট; ইসিবি চত্বরে নিউ গিনি প্রপার্টিজে অস্ত্রধারীদের হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাট; সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও তছনছ-ঘটনাগুলোর ধরন আলাদা হলেও অন্তর্নিহিত প্রশ্ন এক: আইন অমান্য করে শক্তি প্রয়োগের সাহস অপরাধীরা কোথা থেকে পাচ্ছে?
রাড্ডা কেন্দ্রের ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অর্ধশত বছর ধরে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে ভাঙচুর করা হলো। অভিযোগ অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীসহ যন্ত্রপাতি লুট হয়েছে। অথচ এত বড় তাণ্ডব ঠেকাতে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিলেই কি রাষ্ট্রের দায় শেষ হয়? হামলার আগে তথ্য ছিল কি না, পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয়নি, ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিল এবং কার প্রভাব কাজ করেছে-প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে আসতে হবে।
ইসিবি চত্বরের ঘটনাতেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। জমিসংক্রান্ত বিরোধ থাকলে তার নিষ্পত্তির পথ আদালত ও প্রশাসন; অস্ত্র, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাট কোনোভাবেই বিকল্প হতে পারে না। এ ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু তদন্তের চূড়ান্ত ফল না আসা পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিচয় বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান না করে নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও প্রত্যক্ষ হামলাকারী-সবার ভূমিকা আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হবে যদি রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতাসীন দলের কেউ অপরাধ করলে তাকে ছাড় দেওয়া যেমন আইনের শাসনের পরিপন্থী, তেমনি কোনো ব্যক্তির অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো রাজনৈতিক সংগঠনকে দায়ী করাও ন্যায়সংগত নয়। রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত একটাই-অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের ভিত্তি।
দখল, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও মব সহিংসতার অভিযোগ যদি একের পর এক জমতে থাকে, তবে তা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে না; বিনিয়োগ, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপরও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। কারণ কোনো উদ্যোক্তা, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী বা নাগরিক তখন জানবেন না-পরবর্তী আঘাতটি কোথা থেকে আসবে এবং প্রতিকার চাইলে রাষ্ট্রকে পাশে পাবেন কি না।
সরকারের তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিটি হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার জন্য ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের দায়িত্বও স্পষ্ট: অপরাধীকে দলীয় পরিচয়ের নিরাপত্তা দেওয়া নয়, দলীয় শৃঙ্খলা ও আইন-উভয়ের মুখোমুখি করা।
জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে আইনহীনতার আরেক সংস্করণ নয়। যে রাষ্ট্রে দুর্বল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, সেখানে ক্ষমতার পালাবদল অর্থহীন হয়ে পড়ে। এখনই প্রমাণ করতে হবে-দখলদার, চাঁদাবাজ কিংবা সন্ত্রাসী যত প্রভাবশালীই হোক, রাষ্ট্রের আইনের চেয়ে বড় নয় কেউ।
সানা/আপ্র/২৯/৯/২০২৬