যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরঙ্কুশ ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার আকাঙক্ষা রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। গত সোমবার (২৭ জানুয়ারি) মিনেসোটায় ফেডারেল এজেন্টদের হাতে এক মার্কিন নাগরিক হত্যার পর দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে জনরোষ। এতে হোয়াইট হাউসকে তাদের সুর নরম করতে বাধ্য হতে হয়েছে। এতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নীতিতে সংশোধন আনার কথা আলোচনায় উঠেছে। এ পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইউরোপের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ডকে ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নিজের অদম্য কর্তৃত্ব প্রদর্শনের এক দুঃসাহসী চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এর এক সপ্তাহও পার হয়নি।
পাশাপাশি গত সোমবার ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও সুর কড়া করেছেন। তিনি বলেছেন, ওভাল অফিস থেকে তার দেশ চালানোর যে সাম্রাজ্যবাদী চেষ্টা ট্রাম্প করছেন, তাতে তিনি বিরক্ত।
আরেকজন বিশ্বনেতাও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের মন্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। আফগান যুদ্ধে ন্যাটো সেনারা সামনে ছিল না বলে ট্রাম্পের করা দাবিকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে অভিহিত করেছেন স্টারমার। এর পরদিনই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৪৫৭ জন নিহত ব্রিটিশ সেনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি পোস্ট দেন-যা তার ভুল স্বীকারের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
২০২৬ সালের প্রথম মাসটি ট্রাম্পের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার এক বিশৃঙ্খল হিড়িকের মধ্য দিয়ে কাটছে। মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন থেকে শুরু করে বিদেশে মার্কিন সামরিক শক্তির আস্ফালন-সবই ছিল তার ক্ষমতার প্রকাশ। তার এই ক্ষমতার খেলাগুলো একটি সতর্কবার্তা দিচ্ছে যে তিনি একজন লাগামহীন স্বৈরাচারী হয়ে উঠছেন এবং মার্কিন গণতন্ত্রকে ক্ষয় করছেন।
গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘মাঝেমধ্যে আপনার একজন স্বৈরশাসক প্রয়োজন।’ ক্ষমতার প্রথম বছরে তার রসিকতাগুলো এখন আর হাস্যকর মনে হচ্ছে না। কিন্তু নতুন বছরের প্রথম কয়েক সপ্তাহ এ-ও দেখিয়েছে যে ট্রাম্প সবকিছু নিজের মতো করে করতে পারবেন না। তার অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিদেশি শক্তিগুলোরও বলার কিছু আছে-বিশেষ করে যদি তারা জোটবদ্ধ হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির একটি বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ছোট দেশগুলোকে তাদের স্বার্থরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কার্নি বলেন, ‘মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, আমরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকি, তবে আমাদের অন্যের মেনুতে (শিকার) পরিণত হতে হবে।’
মিনেসোটার কৌশল পরিবর্তন: গত সোমবার হোয়াইট হাউস বিলম্বে হলেও বুঝতে পেরেছে যে মিনেসোটায় তারা এক চরম ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে। তবে ট্রাম্পের এই সুর পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে জনরোষ এবং রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ চাপ। রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক ললার সিএনএনকে বলেছেন, ‘সড়কে কোনো মার্কিন নাগরিককে মারা যেতে দেখতে চাই না।’ এমনকি সিনেটর টেড ক্রুজও সতর্ক করেছেন যে প্রশাসনকে তাদের আচরণের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া: গত সপ্তাহে গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় কেউ মারা না গেলেও এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই উত্তেজনার ফলে অনেক মিত্রদেশ এখন বিকল্প অংশীদার খুঁজছে। যেমন কানাডা এখন চীনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির চুক্তির কথা ভাবছে। ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পরিকল্পনাও বাস্তবতার মুখে হোঁচট খাচ্ছে। ২০২৬ সালের এই উত্তাল প্রথম মাসটি দেখিয়েছে যে ট্রাম্পকে একজন অস্পৃশ্য ও অপ্রতিরোধ্য শক্তিশালী নেতা হিসেবে ভাবার সময় এখনো আসেনি। সূত্র: প্রআ অনলাইন
সানা/মেহেদী/আপ্র/২৮/০১/২০২৬