প্রত্যাশা ডেস্ক: মানুষের তৈরি ও যুদ্ধে ব্যবহৃত এযাবৎকালের সবচেয়ে বিধ্বংসী বিস্ফোরক পারমাণবিক অস্ত্র। এগুলোর ধ্বংসক্ষমতা আস্ত এক শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এগুলো হারিয়ে না ফেলার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে সেটিই স্বাভাবিক।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটি সত্যি হলেও গত কয়েক দশকে এমন ছয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র হারিয়ে গিয়েছে এবং সেগুলোর খোঁজ আজো মেলেনি বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
এ ধরনের ঘটনাকে ‘ব্রোকেন অ্যারো’ নামে বর্ণনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে শব্দটি কেবল অস্ত্র হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, বরং পারমাণবিক অস্ত্র সংক্রান্ত যে কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। ব্রোকেন অ্যারো নামে হলিউডে তৈরি একটি সিনেমাও আছে যেটির মূল বিষয় হচ্ছে পারমাণবিক ওয়্যারহেডসহ একটি বি২ স্পিরিট বম্বারের কল্পিত হাইজ্যাকের ঘটনা। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৩২টি ‘ব্রোকেন অ্যারো’ ঘটেছে। যার মধ্যে সাধারণ মানুষের জানা ৬টি ক্ষেত্রে হারানো পারমাণবিক অস্ত্র আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ছিল ১৯৫৮ সালে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিকের ‘বি-৪৭’ নামের এক বোমারু জেট মাঝ-আকাশে অন্য আরেকটি প্লেনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর জর্জিয়ার টাইবি দ্বীপের কাছে ‘এমকে. ১৫’ নামের সচল এক হাইড্রোজেন বোমা ফেলে দিতে বাধ্য হয়। শুরুতে বিষয়টিকে কেবল ‘মহড়া’ বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে, সেই বোমাটি আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
টাইবি দ্বীপের বোমা দুর্ঘটনার মতো এমন ঘটনা পুরো স্নায়ুযুদ্ধ জুড়ে মাঝেমধ্যেই ঘটেছে। সেই সময়ে বিভিন্ন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। তবে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ার পেছনে সংগত যথেষ্ট কারণও রয়েছে। একজন সাধারণ ডুবুরি হঠাৎ করেই কোনো সচল পারমাণবিক বোমার সন্ধান পেয়ে যাবেন– এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এসব ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো মানব ইতিহাসের এমন ছয়টি মুহূর্তকেই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে মানুষ পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিলেও শেষ পর্যন্ত তা হারিয়ে গেছে।
মার্কিন সরকারের ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ এমন এক প্রতিরক্ষা নীতি যার মাধ্যমে সবসময় তিনটি ভিন্ন উপায়ে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন রাখে তারা। একটি হচ্ছে কৌশলগত বোমারু বিমান, যা আকাশ থেকে ফেলা পারমাণবিক বোমা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে সাবমেরিন-চালিত ব্যালিস্টিক মিসাইল বা এএলবিএম, যা সমুদ্রের নিচ থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। তৃতীয়টি হচ্ছে, আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল বা আইসিবিএম, যা ভূমি থেকে উৎক্ষেপিত দীর্ঘ পাল্লার মিসাইল।
টাইবি দ্বীপের ওই বোমাটি ছিল তিন দশমিক আট মেগাটনের এক অস্ত্র। এর ধ্বংসক্ষমতা ছিল নাগাসাকিতে ফেলা বোমার প্রায় ১৯০ গুণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটিই একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র নয়, বরং এর মতো আরো অনেক শক্তিশালী অস্ত্র সমুদ্রের তলদেশে কোথাও পড়ে রয়েছে। সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ পারমাণবিক অস্ত্রটি হারিয়েছিল ১৯৫০ সালে। তখন ‘কনভেয়ার বি-৩৬’ নামের এক বোমারু প্লেন প্রশান্ত মহাসাগরে ৩০-কিলোটন ওজনের ‘এমকে.৪’ বোমা ফেলেছিল। মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রতিবেদন অনুসারে, বোমাটিতে প্লুটোনিয়াম কোর ছিল না। তবে এতে প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়াম ছিল। এর ছয় বছর পর ‘বি-৪৭’ নামের একটি প্লেন ভূমধ্যসাগরে বিধ্বস্ত হয়। প্লেনটি ‘এমকে. ১৫’ ডিভাইসের জন্য দুটি ‘কোর’ বহন করছিল। তার কিছুকাল পর ১৯৬১ সালে ‘বি-৫২’ নামের এক বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। যার ফলে ২৪-মেগাটনের বিশাল এক পারমাণবিক বোমা ধ্বংস হয়ে যায়। বোমাটির চারটি সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে তিনটিই সক্রিয় হয়ে গিয়েছিল।
এ দুর্ঘটনার পর সেই বোমার বড় একটি অংশ মাঠের নিচে মাটির গভীরে গেঁথে যায়। তবে বিমানবাহিনী পরবর্তীতে সেই এলাকাটি সুরক্ষিত করে ফেলে। ফলে এ ক্ষতিটি সমুদ্রের তলদেশে হারিয়ে যাওয়া অন্যান্য অস্ত্রের মতো নয়।
১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে ‘এ-৪ই স্কাইহক’ যুদ্ধবিমান এক মেগাটনের থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা নিয়ে ‘ইউএসএস টিকোন্ডেরোগা’ নামের জাহাজ থেকে গড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে। সেই পাইলট, প্লেন ও বোমা কারোরই আর খোঁজ মেলেনি।
১৯৬৬ সালে মাঝ-আকাশে আরেকটি সংঘর্ষের ফলে চারটি ‘বি২৮’ থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা হারিয়ে যায়, যার মধ্যে কেবল তিনটি উদ্ধার করা গিয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল ভূমধ্যসাগরের ওপর এবং প্রতিটি বোমার ধ্বংসক্ষমতা ছিল এক দশমিক এক মেগাটন।
সর্বশেষ নিখোঁজ পারমাণবিক অস্ত্র হারিয়ে যায় ১৯৬৮ সালে। ওই সময় ‘ইউএসএস স্করপিয়ন’ নামের এক সাবমেরিন ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় ৯৯ জন ক্রু সদস্য ও সেই সঙ্গে ২৫০ কিলোটনের দুটি পারমাণবিক ওয়ারহেড সমুদ্রের তলদেশে তলিয়ে যায়।
সানা/এসি/আপ্র/২৫/০১/২০২৬























