সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করে জাতীয় বেতন কমিশনের মূল বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশ নিঃসন্দেহে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রমাগত ক্রয়ক্ষমতা হারানো সরকারি কর্মচারীদের জন্য এটি এক অর্থে স্বস্তির খবর। তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির নানা স্তরে যে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে, তা অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান। সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের একটি বড় অংশই বেতন ও ভাতা খাতে ব্যয় হয়। মূল বেতন দ্বিগুণ হলে এই ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে; যা রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া সামাল দেওয়া কঠিন। কর কাঠামো সংস্কার, করজালের বিস্তার ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো না গেলে বাজেট ঘাটতি আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি খাতে বেতন ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন নিয়োগে সরকার আরো সতর্ক বা সংযত হতে পারে। এতে তরুণদের জন্য সরকারি চাকরির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও এর প্রভাব পড়বে। সরকারি চাকরির সঙ্গে বেতনবৈষম্য কমাতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হতে পারে; যা তাদের টিকে থাকার সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
আরো একটি গুরুতর দিক হলো, সরকারি ও বেসরকারি পেশাজীবীদের মধ্যে আয়-ব্যয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা। সরকারি খাতে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি হলেও দেশের বৃহৎ অংশের বেসরকারি কর্মজীবী; বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, সেবা খাত এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা একই হারে আয় বৃদ্ধির সুযোগ পাবেন না। ফলে একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বড় অংশ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে আরো কোণঠাসা হবে। এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অসন্তোষ, শ্রেণিগত ক্ষোভ ও পেশাভিত্তিক বিভাজনকে উসকে দিতে পারে; যা সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মোটেই সুখকর নয়।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা মূল্যস্ফীতি। বিপুল অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে; যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে। যদি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে এই অতিরিক্ত চাহিদার সমন্বয় না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। ফলে যে বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে, সেটিই দেশের বেশির ভাগ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই প্রশ্নটি শুধু বেতন বাড়ানো উচিত কি না- তা নয়; বরং কীভাবে, কতটা এবং কোন সময়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে; সেটিই মুখ্য। ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, উৎপাদনশীলতার সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সংযোগ এবং একই সঙ্গে রাজস্ব ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার- এসব সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এমন বড় সিদ্ধান্ত অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য জীবনমান নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনের পথে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়- সেদিকে সমান গুরুত্ব দেওয়াই হবে বিচক্ষণ সুষম রাষ্ট্রনৈতিক সিদ্ধান্ত।
সানা/আপ্র/২৪/০১/২০২৬

























