ঢাকা ০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
সম্পাদকীয়-------------------

বস্তিবাসীকে ফ্ল্যাটের প্রতিশ্রুতি, স্বপ্ন নাকি দায়িত্বশীল পরিকল্পনা?

  • আপডেট সময় : ০৯:৫০:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকার কড়াইল বস্তিবাসীদের জন্য আধুনিক ফ্ল্যাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে কড়াইলবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে এই প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

নির্বাচনের প্রসঙ্গ ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি জানি না, এটা নির্বাচন আচরণবিধিতে পড়বে কি-না, কেউ ষড়যন্ত্র করবে কি-না। কিন্তু আমি যা করতে চাই, আমি আল্লাহর রহমত নিয়ে সবকিছু করতে চাই।
বস্তিবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা কষ্ট করছেন, থাকার কষ্ট করছেন, সেই কষ্টটি আমরা ধীরে ধীরে সমাধান করতে চাই। আমরা এখানে উঁচু উঁচু বড় বড় বিল্ডিং করে দিতে চাই আল্লাহর রহমতে। এবং এখানে যে মানুষগুলো থাকেন, তাদের নামে রেজিস্ট্রি করে আমরা প্রতিটি ছোট ফ্ল্যাট করব এবং সেই ফ্ল্যাটগুলো তাদের নামে আমরা দিতে চাই।’

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে পরিকল্পিত আবাসনের মাধ্যমে কড়াইলের মতো বিশাল বস্তি এলাকাকে আবাসিকে রূপান্তরিত করে নাগরিক মর্যাদা ও নিরাপদ বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও খেলার মাঠসহ অন্যান্য মৌলিক সুবিধা তৈরির অঙ্গীকারও জানানো হয়েছে।

সন্দেহ নেই যে, বস্তি উন্নয়ন তথা বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নের এই অঙ্গীকার একদিকে মানবিক, অন্যদিকে যুগোপযোগী। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। বহু নেতা নির্বাচনি ইশতেহারে উন্নয়ন, বাসস্থান ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, ভোটের আগে মানুষের কল্যাণে যত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তার বাস্তবায়ন চিত্র ভিন্ন। যাও বা বাস্তবায়ন হয়, তার অধিকাংশই টেকসই পরিকল্পনা ও বাজেট ছাড়াই অনেকটা দায়সারাভাবেই করা হয়। ফলে জনগণের প্রকৃত দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হয় কমক্ষেত্রেই।

এর একটি প্রধান কারণ- দুর্নীতি। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ হয়তো বহুক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। কিন্তু নানা ঘাটে ঘুষ-উৎকোচ দিতে দিতে জনস্বার্থের সেই বরাদ্দে প্রকৃত কাজটিই যথাযথভাবে হয় না। সঙ্গত কারণে প্রশ্নটি করতেই হয়- এই যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তা কি শুধু নির্বাচনি উদ্দেশ্যে, নাকি সত্যিকারের বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা?

বাসস্থান বা ফ্ল্যাটের দাবি শুধু একটি ঠিকানা নয়- এটা মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার। কড়াইলের মতো ঢাকার একটি বৃহৎ বসতি, যেখানে হাজার হাজার মানুষ কয়েক দশক ধরে নিরাপদ স্থায়ী বাসস্থান ছাড়াই মানবেতর ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন করে আসছে, সেখানে পরিকল্পিত বসতি বা ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অনেকের কাছে শুধু আকর্ষণীয়ই নয় -এটা মৌলিক মানবাধিকার দাবিও বটে।
অথচ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময় দেখা যায়- সময়, অর্থ বা রাজনীতি সব মিলিয়ে প্রয়াসটি ব্যর্থ হয়ে যায়। সে কারণেই নেতাদের প্রতিশ্রুতি যেন সঠিক পরিকল্পনা, সময়সীমা, বাজেট, প্রশাসনিক নীতি ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের পথসহ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
নেতারা যখন বলেন ‘আমি আপনার ছেলে, আমি আপনার পাশে থাকবো, তখন সেই কথায় থাকা উচিত বিশ্বাসযোগ্য কর্মপরিকল্পনা। কেবল নির্বাচনি মঞ্চ থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। যুক্তি থাকতে হবে কেন এবং কীভাবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিশ্রুতি তখনই মূল্যবান, যখন তা বাস্তবায়িত হয়।

ঢাকার অন্যতম দুঃখের নাম কড়াইল বস্তি। এই বস্তির মানুষের ঘরে ঘরে যে স্বপ্ন ও আশা রয়েছে, তা কেবল নির্বাচনি বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ করে রাখা উচিত হবে না; বরং সেটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সমাজের অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও পদক্ষেপ।

সানা/আপ্র/২১/০১/২০২৬

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

সম্পাদকীয়-------------------

বস্তিবাসীকে ফ্ল্যাটের প্রতিশ্রুতি, স্বপ্ন নাকি দায়িত্বশীল পরিকল্পনা?

আপডেট সময় : ০৯:৫০:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকার কড়াইল বস্তিবাসীদের জন্য আধুনিক ফ্ল্যাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে কড়াইলবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে এই প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

নির্বাচনের প্রসঙ্গ ধরে তারেক রহমান বলেন, আমি জানি না, এটা নির্বাচন আচরণবিধিতে পড়বে কি-না, কেউ ষড়যন্ত্র করবে কি-না। কিন্তু আমি যা করতে চাই, আমি আল্লাহর রহমত নিয়ে সবকিছু করতে চাই।
বস্তিবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘আপনারা কষ্ট করছেন, থাকার কষ্ট করছেন, সেই কষ্টটি আমরা ধীরে ধীরে সমাধান করতে চাই। আমরা এখানে উঁচু উঁচু বড় বড় বিল্ডিং করে দিতে চাই আল্লাহর রহমতে। এবং এখানে যে মানুষগুলো থাকেন, তাদের নামে রেজিস্ট্রি করে আমরা প্রতিটি ছোট ফ্ল্যাট করব এবং সেই ফ্ল্যাটগুলো তাদের নামে আমরা দিতে চাই।’

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেওয়া প্রতিশ্রুতির ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে পরিকল্পিত আবাসনের মাধ্যমে কড়াইলের মতো বিশাল বস্তি এলাকাকে আবাসিকে রূপান্তরিত করে নাগরিক মর্যাদা ও নিরাপদ বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও খেলার মাঠসহ অন্যান্য মৌলিক সুবিধা তৈরির অঙ্গীকারও জানানো হয়েছে।

সন্দেহ নেই যে, বস্তি উন্নয়ন তথা বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নের এই অঙ্গীকার একদিকে মানবিক, অন্যদিকে যুগোপযোগী। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। বহু নেতা নির্বাচনি ইশতেহারে উন্নয়ন, বাসস্থান ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, ভোটের আগে মানুষের কল্যাণে যত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তার বাস্তবায়ন চিত্র ভিন্ন। যাও বা বাস্তবায়ন হয়, তার অধিকাংশই টেকসই পরিকল্পনা ও বাজেট ছাড়াই অনেকটা দায়সারাভাবেই করা হয়। ফলে জনগণের প্রকৃত দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হয় কমক্ষেত্রেই।

এর একটি প্রধান কারণ- দুর্নীতি। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ হয়তো বহুক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। কিন্তু নানা ঘাটে ঘুষ-উৎকোচ দিতে দিতে জনস্বার্থের সেই বরাদ্দে প্রকৃত কাজটিই যথাযথভাবে হয় না। সঙ্গত কারণে প্রশ্নটি করতেই হয়- এই যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তা কি শুধু নির্বাচনি উদ্দেশ্যে, নাকি সত্যিকারের বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা?

বাসস্থান বা ফ্ল্যাটের দাবি শুধু একটি ঠিকানা নয়- এটা মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার। কড়াইলের মতো ঢাকার একটি বৃহৎ বসতি, যেখানে হাজার হাজার মানুষ কয়েক দশক ধরে নিরাপদ স্থায়ী বাসস্থান ছাড়াই মানবেতর ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন করে আসছে, সেখানে পরিকল্পিত বসতি বা ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অনেকের কাছে শুধু আকর্ষণীয়ই নয় -এটা মৌলিক মানবাধিকার দাবিও বটে।
অথচ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময় দেখা যায়- সময়, অর্থ বা রাজনীতি সব মিলিয়ে প্রয়াসটি ব্যর্থ হয়ে যায়। সে কারণেই নেতাদের প্রতিশ্রুতি যেন সঠিক পরিকল্পনা, সময়সীমা, বাজেট, প্রশাসনিক নীতি ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের পথসহ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
নেতারা যখন বলেন ‘আমি আপনার ছেলে, আমি আপনার পাশে থাকবো, তখন সেই কথায় থাকা উচিত বিশ্বাসযোগ্য কর্মপরিকল্পনা। কেবল নির্বাচনি মঞ্চ থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। যুক্তি থাকতে হবে কেন এবং কীভাবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিশ্রুতি তখনই মূল্যবান, যখন তা বাস্তবায়িত হয়।

ঢাকার অন্যতম দুঃখের নাম কড়াইল বস্তি। এই বস্তির মানুষের ঘরে ঘরে যে স্বপ্ন ও আশা রয়েছে, তা কেবল নির্বাচনি বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ করে রাখা উচিত হবে না; বরং সেটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সমাজের অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও পদক্ষেপ।

সানা/আপ্র/২১/০১/২০২৬