ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন শাসক নিকোলা মাদুরোক কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী মহলে এক ধরনের উৎসবমুখর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এই প্রতিক্রিয়াকে শুধু একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন অথবা শাসন পরিবর্তনের স্বস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব হয় নয়, বরং এই উচ্ছাস যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ঘটে যাওয়া একটি গভীর ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন; যা বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভেনেজুয়েলা বিষয়ে ওয়াশিংটনের এই সক্রিয় ও আগ্রাসী ভূমিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ। কেউ কেউ একে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ডনরো নীতি’ বলে আখ্যায়িত করছেন—যার মাধ্যমে উনিশ শতকের মনরো নীতির এক ধরনের আধুনিক পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিকভাবে মনরো নীতি ছিল পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় শক্তির হস্তক্ষেপ ঠেকিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা।
বর্তমান বাস্তবতায় ওই নীতির নতুন ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ যেন আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তবে এই প্রবণতাকে শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের তাৎক্ষণিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা এক ধরনের পুনর্মুখীকরণের ইঙ্গিত বহন করে—যেখানে বৈশ্বিক সর্বজনীন দায়িত্ব ও উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে ভূমিকার বদলে আঞ্চলিক আধিপত্য, শক্তি-রাজনীতি এবং স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান নয়; বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উদার বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে।
ওই প্রবন্ধে ‘মনরো নীতি’র এ পুনরুত্থানকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৃহত্তর রূপান্তরের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে—এই পরিবর্তন কীভাবে উদার গণতান্ত্রিক সর্বজনীনতার ভিত্তিকে দুর্বল করছে এবং বিশ্ব রাজনীতিকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক প্রভাববলয় ও শক্তির ভারসাম্যনির্ভর এক নতুন কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—উদার বিশ্বব্যবস্থা কি সত্যিই তার দীর্ঘদিনের প্রভাব ও বৈধতা হারিয়ে এক অন্তিম পর্বে উপনীত হচ্ছে? এই ভূমিকা সেই প্রশ্নেরই সূচনা টানতে চায়।
ভেনেজুয়েলা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে যদি শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা স্বভাবজাত আগ্রাসী কূটনীতির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। কারণ, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন এমন এক রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে, যেখানে তিনি প্রকাশ্যেই ‘শাসন পরিবর্তন’ ও ‘জাতি গঠন’-নির্ভর দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র আর দূরবর্তী ভূখণ্ডে ব্যয়বহুল ও অনির্দিষ্ট মেয়াদের সংঘাতে জড়াবে না। অথচ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে তার প্রশাসনের কার্যক্রম সেই ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়।
এই আপাতবিরোধ আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের অসংগতি নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এক ধরনের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের প্রতিফলন। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মানসিকতা ও রাজনৈতিক প্রবণতা এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, পুরো প্রক্রিয়াটি তার একক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়।
ভেনেজুয়েলা বিষয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক অনুমোদন ট্রাম্প দিলেও নীতিগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (পেন্টাগন) এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)। এই সমন্বিত উদ্যোগ স্পষ্ট করে যে, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে প্রশাসনের ভেতরে একটি বিস্তৃত ও সুসংহত ঐকমত্য বিদ্যমান।
ওই নীতিগত অবস্থানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়া যায় নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব গোলার্ধে কোনো অগোলার্ধভুক্ত প্রতিযোগী শক্তিকে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে কিংবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে দেবে না। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ এমন এক পররাষ্ট্রনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে বৈশ্বিক সর্বজনীন দায়িত্বের বদলে আঞ্চলিক প্রাধান্য ও শক্তি-নির্ভর ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ওই গোলার্ধকেন্দ্রিক শক্তি রাজনীতির অন্তর্নিহিত যুক্তি অনুধাবনের জন্য ট্রাম্পের অন্যান্য আন্তর্জাতিক অবস্থানও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ইউক্রেনের একটি বড় অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে তার অনীহা কিংবা তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের আগ্রাসী মনোভাবের প্রতি তার তুলনামূলক নির্লিপ্ততা—এই অবস্থানগুলো আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এগুলোর পেছনে একটি অভিন্ন কৌশলগত যুক্তি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের একটি প্রভাবশালী অংশ দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বৈশ্বিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে নিজেদের ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আগ্রহী।
ওই মানসিকতার একটি প্রতীকী প্রকাশ দেখা যায় ট্রাম্পের উনিশ শতকের প্রেসিডেন্ট জেমস কে. পোলকের প্রতি প্রকাশ্য প্রশংসায়। মেক্সিকোর সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত সম্প্রসারণে পোলকের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিকভাবে সর্বাধিক। আজ তার প্রতিকৃতি ওভাল অফিসে স্থান পাওয়াটা নিছক নান্দনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি এমন এক ইতিহাসচেতনার প্রতিফলন, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সম্প্রসারণবাদী ও আঞ্চলিক আধিপত্যকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে চায়।
ওই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বিশৃঙ্খল বা দিশাহীন নয়। বরং এটি এমন একটি প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত বহন করে, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের নস্টালজিক দৃষ্টিতে ফিরে তাকাতে চায়—যে সময় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙক্ষা ছিল সীমিত এবং নিজস্ব প্রতিবেশী অঞ্চলে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে প্রশ্নাতীত ছিল।
যদিও দুটি বিশ্বযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, তবুও জর্জ ওয়াশিংটন ও জন কুইন্সি অ্যাডামসের বিদেশি জটিলতা ও স্থায়ী জোট এড়িয়ে চলার ঐতিহাসিক আহ্বান মার্কিন জাতীয় মানস থেকে কখনোই পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। সমসাময়িক মার্কিন রাজনীতিতে এই প্রবণতার পুনরুত্থান ঘটছে অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের মধ্য দিয়ে—অভিবাসনের চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আজকের মার্কিন ভোটারদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে সাধারণত দুটি পরস্পরবিরোধী তাত্ত্বিক কাঠামোর আশ্রয় নেওয়া হয়। একদিকে রয়েছে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের অবসান’ তত্ত্ব- যেখানে উদার গণতন্ত্রকে মানব রাজনৈতিক বিবর্তনের চূড়ান্ত ও সর্বজনীন রূপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে শীতল যুদ্ধের অবসানের মাধ্যমে প্রধান আদর্শিক দ্বন্দের নিষ্পত্তি ঘটেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। অন্যদিকে রয়েছে জার্মান আইন-দার্শনিক কার্ল স্মিটের চিন্তাধারা- যা উদার সর্বজনীনতাকে মৌলিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
স্মিটের মতে, ইতিহাস কখনোই একটি একক, বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামোয় এসে শেষ হয় না। তার দৃষ্টিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল একটি সাময়িক ও ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম; যা নির্দিষ্ট শক্তি-ভারসাম্যের ফলাফল মাত্র।
স্মিট ধারণা করেছিলেন, নতুন উদীয়মান অ-উদার শক্তিগুলো নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাববলয় গড়ে তুলতে শুরু করলে এই উদার ব্যবস্থা অনিবার্যভাবেই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। এই আঞ্চলিক আধিপত্যনির্ভর কাঠামোকেই তিনি ‘গ্রোসরাউম’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—যেখানে প্রতিটি অঞ্চলে একটি প্রধান শক্তি রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিসর নিয়ন্ত্রণ করবে।
ওই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গৌণ, এমনকি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। স্মিটের মতে, জাতিসংঘ, ন্যাটো কিংবা বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থাগুলো মূলত বিজয়ী শক্তির আধিপত্যকে সর্বজনীন নীতির ছদ্মবেশে প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। এই বিশ্লেষণের আলোকে বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উদার বিশ্বব্যবস্থার ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া এবং আঞ্চলিক শক্তি-রাজনীতির পুনরুত্থানকে একটি পূর্বানুমেয় ঐতিহাসিক পরিণতি হিসেবেই দেখা যায়।
ওই বিশ্লেষণের আলোকে দেখলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন নেতার রাজনৈতিক উত্থানকে কোনো আকস্মিক ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন। যখন একটি রাষ্ট্র একযোগে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নিরাপত্তাগত চাপে আক্রান্ত হয়, তখন নিয়মভিত্তিক ও ধীরগতির বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই শূন্যতায় সামনে আসে এমন নেতৃত্বের আকাঙক্ষা, যারা জটিল প্রক্রিয়ার বদলে দ্রুত, একক ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়; এটি সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনীতির একটি বিস্তৃত লক্ষণ।
ওই প্রেক্ষাপটে ‘মনরো নীতি’র পুনরুত্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বল্পমেয়াদে কৌশলগত স্বস্তি বয়ে আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য হবে চড়া। পশ্চিম গোলার্ধে একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস যুক্তরাষ্ট্রকে তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত নড়বড়ে করে তুলতে পারে। এর প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে ন্যাটোর কার্যকারিতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, ইউরোপে নতুন ধরনের পূর্ব—পশ্চিম উত্তেজনা ও সশস্ত্র সংঘাতের সম্ভাবনা উসকে উঠতে পারে এবং পূর্ব এশিয়ায় চীন নিজেদের আঞ্চলিক উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্যই ওই দৃশ্যপট অনিবার্য নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারসাম্য অনেক সময় অপ্রত্যাশিতভাবে টিকে থাকে; জোট ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়; রাষ্ট্রনেতারাও কখনো কখনো কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসেন। সম্ভবত ন্যাটো ভেঙে পড়বে না, ইউরোপ আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতে জড়াবে না কিংবা এশিয়া- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না।
তবু ওই ‘হয়তো’র ওপর ভর করেই যে বিশ্বব্যবস্থা এতদিন টিকে ছিল, এর নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি আজ স্পষ্টতই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ কারণেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আর এই নয় যে উদার বিশ্বব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে কি না; বরং প্রশ্ন হলো—তার ওপর আর কতটা নির্ভর করা সম্ভব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা দীর্ঘদিন ধরে শক্তির রাজনীতিকে সংযত করেছে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি কাঠামো প্রদান করেছে। আজ সেই কাঠামোর প্রতি প্রধান শক্তিগুলোর আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, আর তার জায়গা নিচ্ছে আঞ্চলিক আধিপত্য, শক্তি-নির্ভর ভারসাম্য এবং স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি।
ওই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতি হয়তো সম্পূর্ণ অন্ধকারে প্রবেশ করছে না, কিন্তু একটি দীর্ঘ প্রভাতের অবসান যে ঘটেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। উদার বিশ্বব্যবস্থা হয়তো আজই শেষ হয়ে যায়নি, তবে তার স্বর্ণযুগ যে অতীত হয়ে গেছে—সে ইঙ্গিত ইতোমধ্যে স্পষ্ট।
ওই বাস্তবতা উপলব্ধি করাই এই প্রবন্ধের মূল বার্তা- একটি নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার অবসান শুধু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্তের ফল নয়; এই ব্যবস্থাকে ধারণ ও রক্ষা করার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ক্রমাবনতিরও প্রতিফলন।
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
sarkerjahangiralam78@gmail.com
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

























