নিজস্ব প্রতিবেদক: নিরাপদে সংস্কৃতি চর্চা করার প্রত্যাশার কথা জানিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফিরেছে ছায়ানট। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) থেকে ঢাকার ধানমন্ডিতে ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে আয়োজন করা হয় দুই দিনের ‘শুদ্ধসংগীত উৎসব’, যা উৎসর্গ করা হয়েছে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসামান হাদির মৃত্যুর খবরে গেল মাসে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ভবনে। এ ঘটনায় ‘ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের’ পাঠদানসহ সংগঠনের সব কার্যক্রম পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
গত ১ জানুয়ারি থেকে দাপ্তরিক কাজ এবং তার দুদিন পর থেকে সঙ্গীতবিদ্যায়তনের নিয়মিত পাঠদান শুরু হয় ছায়ানট ভবনে। এবার অনুষ্ঠানে ফিরলো দেশের সবচেয়ে নামি সাংস্কৃতিক সংগঠনটি।
‘শুদ্ধসংগীত উৎসবের’ উদ্বোধনী বক্তব্যে ‘সংস্কৃতির যাত্রা নির্বিঘ্ন’ করার প্রত্যাশার কথা বলেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা খুব সহজ। আমরা একটা নিরাপদ স্বদেশ ভূমি চাই। আমাদের দেশ একটি নিরাপদ জনপদ হোক এবং সংস্কৃতির যাত্রা নির্বিঘ্ন হোক। আমরা নিরাপদে সংস্কৃতি চর্চা করতে চাই।
২০০১ সালে রমনার বটমূলে বোমা বিস্ফোরণের সময় ছায়ানট যা বলেছিল, ২০২৬ সালের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়েও আমরা একই কথা বলছি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শাহ আবদুল করিম, দ্বিজেন্দ্রলাল বা অতুলপ্রসাদ যে সঙ্গীত রচনা ও পরিবেশন করেছেন, সেটি অপর কোনো রাষ্ট্রের একক উত্তরাধিকার নয় বলেও মন্তব্য করেন সারওয়ার আলী।
তিনি বলেন, মানুষই এসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থেকে নিজেদের নিবৃত করব, এমন নির্বোধ জাতি তো আমরা না। যারা আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে বলি— এই কাজ থেকে নিবৃত থাকবেন। বাংলার সংস্কৃতি চর্চা নির্বিঘ্ন হোক।
ছায়ানট ভবনে হামলার কথা স্মরণ করে সারওয়ার আলী বলেন, ‘এই ভবনে একটা অঘটন ঘটেছিল, তারপরে এটিই প্রথম আয়োজন।’
ভবনের প্রতিটি কক্ষে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা হয় দাবি করে সারওয়ার আলী বলেন, তাদের মূল আক্রোশ ছিল সঙ্গীত শিক্ষার জন্য ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলোর ওপর। তাদের আক্রোশ ছিল ‘নালন্দা’ নামক যে শিশু বিদ্যালয়টি চলে, তাদের পাঠ্যপুস্তক এবং সহকারী পুস্তকগুলো নষ্ট করা। এর আগে বাউল শিল্পীদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, একজন তরুণ নেতার মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সেই সুযোগ নিয়ে তারা ছায়ানটের সবকিছুর ওপর আঘাত হানতে চায় এবং আমাদের ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণের চেয়ে অনেক বড় হলো ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে সেটি। এই ক্ষত এই ভবনের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মাঝে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চার করেছে।
হামলার পর দ্রত কার্যক্রমে ফেরার কথা জানিয়ে সারওয়ার আলী বলেন, ‘ওরা আমাদের সংস্কৃতি কর্মকাণ্ড থেকে বিরত করতে চায়, কিন্তু আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়েছি কত দ্রুত ফিরে আসতে পারি। স্বাভাবিক ছন্দে আত্মশক্তি নিয়ে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ছায়ানট তার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে; সংগীত শিক্ষার ক্লাস শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, আমরা চাই নাট্যকর্মীরা নাটক করুক, বাউলরা পালা গান করুক এবং সাংবাদিকরা তাদের বিবেক ও নীতি অনুযায়ী কাজ করুক। আমরা নিরাপদে সংগীত চর্চা করতে চাই। নিরাপদে সংবাদমাধ্যম কাজ করবে, সেটিও চাই। এটা কি খুব বেশি চাওয়া? এটি তো সাধারণ চাওয়ার বিষয়।
এর আগে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘শুদ্ধসংগীত উৎসব’। এবারের দুই দিনব্যাপি উৎসব সাজানো হয়েছে তিনটি অধিবেশনে। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলে প্রথম দিনের অধিবেশন। উৎসবের পর্দা নামবে শনিবার। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলবে উৎসবের দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশন। দুপুর ২টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সমাপনী অধিবেশন চলবে।
সানা/আপ্র/১০/০১/২০২৬

























