যৌন হয়রানির সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য কোনো সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। সাধারণভাবে নারীদের তার বাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে, পথে, যানবাহনে কথা, ইঙ্গিত ও ফন্দির মাধ্যমে শারীকিভাবে সমাজবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়াকে যৌন হয়রানি বোঝানো হয়। তবে যৌন হয়রানির ধারণা এত ব্যাপক যে, সংজ্ঞার মাধ্যমে এর সবকিছুকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। অন্যভাবে বলা যায়, যৌন হয়রানি হলো যে কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত যৌন আচরণ, যৌনতা সুযোগের অনুরোধ অথবা যৌন আবেদনমূলক মৌখিক বা শারীরিক আচরণ অথবা যৌন প্রকৃতির অন্য কোনো প্রকারের আচরণ। এটি অন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, অপমান বা হয়রানিরূপে গণ্য হয়। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
বাংলাদেশের নারী আজ সংসারের দেয়াল পেরিয়ে সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তারা শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যাংকার, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা প্রায় সবখানেই সমান তালে কাজ করছেন। তবুও এক কঠিন বাস্তবতা রয়ে গেছেন ঘরের বাইরের পৃথিবীতে নারীরা। চলন্ত শহরের অন্যতম ভয় হলো গণপরিবহনে প্রতিদিন হাজারো নারী যাতায়াত করেন। অথচ অনেকের যাত্রা শেষ হয় মানসিক আঘাত নিয়ে; জন্ম নেয় এক বিভীষিকা।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অনেক নারী সাহস করে প্রতিবাদ করলেও আশপাশের মানুষ সাধারণত চুপ থাকে আবার কোথাও কোথাও উল্টো নারীকেই দোষারোপ করা হয়। এই নীরবতা অপরাধীদের আরো সাহসী করে তুলছে।
কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান যত শক্তিশালী হোক, তাদের সম্মান এখনও অনিশ্চিত। বস বা সহকর্মী সবাই সুযোগ নিতে চায়। বাংলাদেশ শ্রম মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী কর্মী জীবনকালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই নীরব থেকেছেন চাকরি হারানোর ভয়ে, সমাজের চোখে অপমানের আশঙ্কায় কিংবা ‘এটা তেমন কিছু নয়’- এই ভুল ধারণায়। দৃষ্টির আঘাতও সহিংসতা।
রাস্তা, বাজার, পার্ক এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীর উপস্থিতিকে ঘিরে থাকে অশালীন দৃষ্টির আঘাত। হাতে ধরা যথাযথ প্রমাণ না থাকলেও এই দৃষ্টিগুলো নারীর মনে ভয়ের বীজ বপন করে। চোখের দৃষ্টিতেই যেন ধর্ষিত হয় নারী।
নারীর হাসি, পোশাক বা উপস্থিতি নিয়ে কটু মন্তব্যের সংস্কৃতি আমাদের সমাজে এখনো প্রবল। এগুলো নারী অবমাননার সূক্ষ্ম রূপ; যা সময়ের সাথে বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। আইন আছে, প্রয়োগ নেই।
বাংলাদেশে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৯ সালের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিচারের বিলম্ব, সামাজিক চাপ এবং সাক্ষীর অভাবে অধিকাংশ অভিযোগ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধীরা বেকায়দায় পড়ে না, বরং ভুক্তভোগীই হয় অপরাধী। সামাজিকতার ভয়ে নারীর নীরবতাই আমাদের সামষ্টিক পরাজয়। এর থেকে উত্তরণের উপায় হালো-
পরিবারের দায়িত্ব: ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে— নারী কোনো বস্তু নয়, মানুষ। সম্মান শেখা মানে মানুষ হওয়া।
গণপরিবহনে প্রযুক্তি ব্যবহার: সিসিটিভি, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং নারীবান্ধব যানবাহন বৃদ্ধি জরুরি।
অফিসে কমিটি সক্রিয় করা: যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি শুধু কাগজে নয়, বাস্তবে সক্রিয় করতে হবে।
দ্রুত বিচার প্রতিষ্ঠা: যে কোনো হয়রানি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া আবশ্যক।
মিডিয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: বিজ্ঞাপন, নাটক ও পাঠ্যবইয়ে নারীর মর্যাদা মানবিকভাবে উপস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
রাতের শহরে একাকী হাঁটার সময় একজন নারী যখন ভয় পান, তখন মা মেয়েকে বলেন- ’চাদরটা ঠিক করে নিস, বাইরে যাচ্ছিস।’ এটিই বুঝিয়ে দেয় আমরা এখনো নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পারিনি।
আমরা শুধু ভয় সহ্য করা শিখেছি। নারীর নিরাপত্তা কোনো নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব নয়। এটি মানবতার প্রশ্ন, সমাজ ও বিবেকের পরীক্ষা। যেদিন নারীরা রাস্তায় নির্ভয়ে হাঁটবেন, সেদিনই সত্যিকারের সভ্য সমাজ হিসেবে দাবি করা যাবে।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ


























