ঢাকা ০৮:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫

অতিমারির সময়ে শিশুদের মনোজগত বুঝে যতœ নিতে হবে

  • আপডেট সময় : ১০:১২:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ অগাস্ট ২০২১
  • ১৩৮ বার পড়া হয়েছে

জাকিয়া রহমান : করোনাভাইরাস অতিমারির কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে আমরা প্রায় ঘরবন্দি। বড়দের পাশাপাশি এই বদ্ধাবস্থার প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিশুদের মনের ওপরে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রুখতে দীর্ঘদিন বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে বন্ধু-সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে পারস্পরিক ভাব বিনিময়, মিথস্ক্রিয়া না থাকায় বিষন্নতা তৈরি হচ্ছে শিশুর মনে। শিশুদের আচরণগত সমস্যার পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট এই অবস্থাকে ‘নিউ নরমাল’ বাস্তবতা বলা হচ্ছে। বড়দের মতো শিশুরা এই ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। সময়মতো খাওয়া, ঘুম কিংবা পড়তে বসার রুটিনও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তাদের। অনেক অভিভাবক বলছেন, সন্তানেরা আগের তুলনায় বেশি জেদ করছে, কেউ বেশি কান্নাকাটি করছে, কেউবা নিজেকে গুটিয়ে রাখছে।

মহামারিকালের এই সংকটাবস্থায় এই ধরণের চাপ মোকাবেলায় শিশুদের প্রয়োজন বিশেষ যতœ। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন ও ধৈর্যশীল হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, করোনাকালে শিশুদের মনের ওপর যে চাপ পড়ছে তা মোকাবেলা করার সক্ষমতা তাদের এখনও হয়ে ওঠেনি। তাই এসময় শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বাবা-মাকে শিশুসন্তানের মনোজগতটা তাদের মতো করে বুঝতে হবে।

এই জন্য বাবা-মাকে শিশুদের গুণগত সময় দিতে হবে। তাদের নিয়ে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ যেমন- মজার কোনও গল্পের বই পড়া, ছড়া আবৃত্তি করা, দাবা, লুডু বা অন্য কোনও ঘরোয়া খেলায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এতে করে ঘরবন্দি সময়ে শিশুদের একঘেয়েমি ভাবটা দূর হয়ে যায়। করোনাকালে অভিভাবকদের অস্থিরতা-শংকা-দুশ্চিন্তাও শিশুদের মনকে বিচলিত করতে পারে। তাই অভিভাবকদের নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস করাও জরুরি।

অনেক শিশু-কিশোর এখন অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে ক্লাসের সময়ের বাইরেও মোবাইল বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। এ কারণে শিশুদের মধ্যে কম্পিউটার ও মোবাইলফোন ব্যবহারে আসক্তি বাড়ছে। বাড়ির বড়রা যদি নিজেরাই সারা দিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকেন, তাহলে সন্তানও তাই করবে!

সারাদিনে একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলার চেষ্টা করলে এই আসক্তি থেকে বড়-ছোট সকলকেই দূরে রাখা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের রুটিন। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যেতে হবে এবং ঘুমের কমপক্ষে দুই ঘণ্টা আগেই মুঠোফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ইন্টারনেটের সাহায্যে শিশুদেরকে আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিকভাবে সংযুক্ত রাখতে পারলে তাদের ভয়-ভীতি দূর হবে ও কিছুটা সামাজিকীকরণ হবে।

সারা বিশ্ব মহামারীতে মৃত্যু ঠেকাতে ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে এই ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেওয়া যায়, কীভাবে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে অভিভাবকদের।

আরসব দুর্যোগের মতো এই অতিমারীর বিপদকালও চিরস্থায়ী নয়। তাই আমাদের আশাহত হওয়া চলবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় নতুন জীবনধারা রপ্ত করার কৌশল শেখাতে হবে শিশুদের। তাদের মধ্যে সুন্দর অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই আশা রাখা যায়- পৃথিবীর বুকে যেমন পরিস্থিতিই আসুক না কেন আমাদের সন্তানেরা তা সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারবে।

লেখক: শিক্ষক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিভিন্ন এজেন্সি থেকে জঙ্গি লিস্ট দিয়ে বলা হতো ছাড়া যাবে না

অতিমারির সময়ে শিশুদের মনোজগত বুঝে যতœ নিতে হবে

আপডেট সময় : ১০:১২:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ অগাস্ট ২০২১

জাকিয়া রহমান : করোনাভাইরাস অতিমারির কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে আমরা প্রায় ঘরবন্দি। বড়দের পাশাপাশি এই বদ্ধাবস্থার প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিশুদের মনের ওপরে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রুখতে দীর্ঘদিন বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে বন্ধু-সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে পারস্পরিক ভাব বিনিময়, মিথস্ক্রিয়া না থাকায় বিষন্নতা তৈরি হচ্ছে শিশুর মনে। শিশুদের আচরণগত সমস্যার পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট এই অবস্থাকে ‘নিউ নরমাল’ বাস্তবতা বলা হচ্ছে। বড়দের মতো শিশুরা এই ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। সময়মতো খাওয়া, ঘুম কিংবা পড়তে বসার রুটিনও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তাদের। অনেক অভিভাবক বলছেন, সন্তানেরা আগের তুলনায় বেশি জেদ করছে, কেউ বেশি কান্নাকাটি করছে, কেউবা নিজেকে গুটিয়ে রাখছে।

মহামারিকালের এই সংকটাবস্থায় এই ধরণের চাপ মোকাবেলায় শিশুদের প্রয়োজন বিশেষ যতœ। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন ও ধৈর্যশীল হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, করোনাকালে শিশুদের মনের ওপর যে চাপ পড়ছে তা মোকাবেলা করার সক্ষমতা তাদের এখনও হয়ে ওঠেনি। তাই এসময় শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বাবা-মাকে শিশুসন্তানের মনোজগতটা তাদের মতো করে বুঝতে হবে।

এই জন্য বাবা-মাকে শিশুদের গুণগত সময় দিতে হবে। তাদের নিয়ে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ যেমন- মজার কোনও গল্পের বই পড়া, ছড়া আবৃত্তি করা, দাবা, লুডু বা অন্য কোনও ঘরোয়া খেলায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এতে করে ঘরবন্দি সময়ে শিশুদের একঘেয়েমি ভাবটা দূর হয়ে যায়। করোনাকালে অভিভাবকদের অস্থিরতা-শংকা-দুশ্চিন্তাও শিশুদের মনকে বিচলিত করতে পারে। তাই অভিভাবকদের নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস করাও জরুরি।

অনেক শিশু-কিশোর এখন অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে ক্লাসের সময়ের বাইরেও মোবাইল বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। এ কারণে শিশুদের মধ্যে কম্পিউটার ও মোবাইলফোন ব্যবহারে আসক্তি বাড়ছে। বাড়ির বড়রা যদি নিজেরাই সারা দিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকেন, তাহলে সন্তানও তাই করবে!

সারাদিনে একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলার চেষ্টা করলে এই আসক্তি থেকে বড়-ছোট সকলকেই দূরে রাখা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের রুটিন। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যেতে হবে এবং ঘুমের কমপক্ষে দুই ঘণ্টা আগেই মুঠোফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ইন্টারনেটের সাহায্যে শিশুদেরকে আত্মীয় ও বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিকভাবে সংযুক্ত রাখতে পারলে তাদের ভয়-ভীতি দূর হবে ও কিছুটা সামাজিকীকরণ হবে।

সারা বিশ্ব মহামারীতে মৃত্যু ঠেকাতে ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে এই ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেওয়া যায়, কীভাবে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে অভিভাবকদের।

আরসব দুর্যোগের মতো এই অতিমারীর বিপদকালও চিরস্থায়ী নয়। তাই আমাদের আশাহত হওয়া চলবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় নতুন জীবনধারা রপ্ত করার কৌশল শেখাতে হবে শিশুদের। তাদের মধ্যে সুন্দর অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই আশা রাখা যায়- পৃথিবীর বুকে যেমন পরিস্থিতিই আসুক না কেন আমাদের সন্তানেরা তা সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারবে।

লেখক: শিক্ষক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।