ঢাকা ০৭:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

আমাদের শিশুশ্রম নিরসন দিবস আছে, শিশু শ্রমিকও আছে

  • আপডেট সময় : ০২:৫২:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১
  • ১৪৬ বার পড়া হয়েছে

প্রত্যাশা ডেস্ক : ‘আমার বয়স ১৮। সাড়ে চার বছর আগে মায়ের সঙ্গে আমিও চাকরিতে ঢুকি। আমাদের ফ্লোরে ১১-১২ বছর থেকে সব বয়সী শ্রমিক কাজ করতো। জানেন, আমার মা কিছুদিন বাসায় বসে ছিল, আবার মৃত্যু তাকে কাজে ডাইকা আনছে। আমরা যখন কাজ করতাম তখন মোবাইল নিয়ে ঢুকতে দিতো না। তাই যারা মারা গেছে তাদের বেশিরভাগেরই স্বজনদের সাথে শেষ কথা বলতে পারেনি।’
কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত ফাতেমা বেগমের ছেলে মুস্তাকিম। তিনি নিজেও ১৩ বছর বয়সে ওই কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার (৮ জুন) বিকাল সাড়ে ৫টায় সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুডস লিমিটেডের সাত তলা ভবনের ওই কারখানায় হঠাৎ আগুন লাগে। অগ্নিকা-ে মৃত্যু হয় ৫২ শ্রমিকের। তাদের মধ্যে মুস্তাকিমের মা ফাতেমা একজন। অন্যান্য লাশের সঙ্গে ফাতেমাকেও আনা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) মর্গে। কোনও লাশই দেখে চেনার উপায়ে নেই। তাই ডিএনএ টেস্ট করা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার সকাল থেকে মর্গের সামনেই নেওয়া হচ্ছে স্বজনদের নমুনা। সেখানে বসেই কথা হচ্ছিল মুস্তাকিমের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই কারখানারই পাশের তিনতলা ভবনে তিনবছর আগেও একবার আগুন লেগেছিল। এবার সাততলা ভবনে লেগেছে। তিনবছর আগের আগুনে তেমন ক্ষতি হয়নি, তবে এবার কিছুই রক্ষা পায়নি।
কারখানার কাজের অভিজ্ঞতা থেকে মুস্তাকিম জানালো, কর্মীদের ভেতরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দেওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যার একতলার আগুন শুক্রবার দুপুরে এসে তিনতলায় যায়। ভেতরে এত রকমের দাহ্য পদার্থ ছিল- জানা না থাকায় সমস্যা হচ্ছে বলে আমরা বারবার বলছিলাম।
দেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও শিশুদের দিয়েই চলছিল এই জুস কারখানাটি। মুস্তাকিম বলেন, এই কারখানায় ১১ থেকে ১৬ বছরের শিশুরা কাজ করে। মা-ছেলে বা মা-মেয়ে একসাথে কাজ করে এরকম অনেক আছে।
মুস্তাকিমের কথার সত্যতা মেলে কারখানাটির আরেক শ্রমিক রাজিবের কথায়। তিনি বলেন, এখানকার বেশিরভাগ শ্রমিকই শিশু। তাদের মধ্যে যারা মেয়ে তাদের বয়স ১২ বছর থেকে শুরু আর ছেলেদের বয়স ১৪ থেকে শুরু। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এখানে ৩ হাজার থেকে শুরু করে ৬ হাজার টাকা বেতনে কাজ করে, ওভারটাইমও আছে।
শিশুদের ঝুকিপূর্ণ শ্রম থেকে সরিয়ে আনার বিষয়ে ২০১৬ সালের প্রথম টার্গেট অর্জনে ব্যর্থ হলে ২০২১ সাল পর্যন্ত নতুন টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। তবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শিশুশ্রম নিরসন নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেই। আর এই বিষয় নিয়ে তেমন কোনও আলাপ-আলোচনাও নেই। বেসরকারি সংস্থার অনুদান না থাকায় কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ার উদাহরণ টেনে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, গ্রামের শিশুকে গ্রামেই ধরে রেখে খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আর তা না পারলে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে না। যে কারণে সরকারি-বেসরকারি কোনও কার্যকর উদ্যোগই দু’বছরেও দৃশ্যমান হয়নি।
২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের আইন থাকলেও দেশেরকোন খাতে কত শিশুশ্রমিক কাজ করছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
কর্মজীবী নারী’র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সানিজদা সুলতানা বলেন, আমাদের ফোরাম থেকে গতকালকেই নারায়ণগঞ্জ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হয়। তারা তখনও বলছে কোন শিশু কাজ করে না। যারা কাজ করে তারা কিশোর। যেহেতু শ্রম আইনে বিশেষ ব্যবস্থায় বলা হয়, কিছু শর্ত সাপেক্ষে কিশোররা কাজ করতে পারে, এখন কিশোর সাজানো হচ্ছে। গণমাধ্যমে আমরা শুনছিলাম মালিক এর দায় নিবে না। কেবল মালিক কেন, কারখানা পরিদর্শনের দায়িত্ব যাদের তাদেরকেও দায় নিতে হবে। এখন এই দাবি তোলার সময় হয়েছে।
শিশু অধিকারকর্মী গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বাংলাদেশ শিশু আইনে ১৮ আর শ্রম আইনে ১৬ বছরের শিশুরা কাজে যোগদিতে পারবে বলে সুযোগ নেওয়া হয় কিন্তু ১৪ বছরের সেই শিশু কাজে যোগ দিতে পারবে যাকে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসক শারীরিকভাবেকাজে সক্ষম বলে সনদ দিবে। এসব কোন নিয়মই মানা হয় না। যে ঝুকিপূর্ণ ৩৮ কাজের তালিকা আছে তার অন্তত চারটি এইকারখানায় সরাসরি ভায়োলেট করা হয়েছে। এসব মনিটরিং করার কি কেউ নেই? তিনি বলেন, কারখানায় শিশু মারা যাওয়ারপরে আমরা জানতে পারবো সেখানে শিশু ছিল এটা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রশ্ন।
শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান ঘটনার পরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, কারখানাটি শিশু শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, তবে মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

আমাদের শিশুশ্রম নিরসন দিবস আছে, শিশু শ্রমিকও আছে

আপডেট সময় : ০২:৫২:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১

প্রত্যাশা ডেস্ক : ‘আমার বয়স ১৮। সাড়ে চার বছর আগে মায়ের সঙ্গে আমিও চাকরিতে ঢুকি। আমাদের ফ্লোরে ১১-১২ বছর থেকে সব বয়সী শ্রমিক কাজ করতো। জানেন, আমার মা কিছুদিন বাসায় বসে ছিল, আবার মৃত্যু তাকে কাজে ডাইকা আনছে। আমরা যখন কাজ করতাম তখন মোবাইল নিয়ে ঢুকতে দিতো না। তাই যারা মারা গেছে তাদের বেশিরভাগেরই স্বজনদের সাথে শেষ কথা বলতে পারেনি।’
কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত ফাতেমা বেগমের ছেলে মুস্তাকিম। তিনি নিজেও ১৩ বছর বয়সে ওই কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার (৮ জুন) বিকাল সাড়ে ৫টায় সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুডস লিমিটেডের সাত তলা ভবনের ওই কারখানায় হঠাৎ আগুন লাগে। অগ্নিকা-ে মৃত্যু হয় ৫২ শ্রমিকের। তাদের মধ্যে মুস্তাকিমের মা ফাতেমা একজন। অন্যান্য লাশের সঙ্গে ফাতেমাকেও আনা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) মর্গে। কোনও লাশই দেখে চেনার উপায়ে নেই। তাই ডিএনএ টেস্ট করা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার সকাল থেকে মর্গের সামনেই নেওয়া হচ্ছে স্বজনদের নমুনা। সেখানে বসেই কথা হচ্ছিল মুস্তাকিমের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই কারখানারই পাশের তিনতলা ভবনে তিনবছর আগেও একবার আগুন লেগেছিল। এবার সাততলা ভবনে লেগেছে। তিনবছর আগের আগুনে তেমন ক্ষতি হয়নি, তবে এবার কিছুই রক্ষা পায়নি।
কারখানার কাজের অভিজ্ঞতা থেকে মুস্তাকিম জানালো, কর্মীদের ভেতরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দেওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যার একতলার আগুন শুক্রবার দুপুরে এসে তিনতলায় যায়। ভেতরে এত রকমের দাহ্য পদার্থ ছিল- জানা না থাকায় সমস্যা হচ্ছে বলে আমরা বারবার বলছিলাম।
দেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও শিশুদের দিয়েই চলছিল এই জুস কারখানাটি। মুস্তাকিম বলেন, এই কারখানায় ১১ থেকে ১৬ বছরের শিশুরা কাজ করে। মা-ছেলে বা মা-মেয়ে একসাথে কাজ করে এরকম অনেক আছে।
মুস্তাকিমের কথার সত্যতা মেলে কারখানাটির আরেক শ্রমিক রাজিবের কথায়। তিনি বলেন, এখানকার বেশিরভাগ শ্রমিকই শিশু। তাদের মধ্যে যারা মেয়ে তাদের বয়স ১২ বছর থেকে শুরু আর ছেলেদের বয়স ১৪ থেকে শুরু। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এখানে ৩ হাজার থেকে শুরু করে ৬ হাজার টাকা বেতনে কাজ করে, ওভারটাইমও আছে।
শিশুদের ঝুকিপূর্ণ শ্রম থেকে সরিয়ে আনার বিষয়ে ২০১৬ সালের প্রথম টার্গেট অর্জনে ব্যর্থ হলে ২০২১ সাল পর্যন্ত নতুন টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। তবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শিশুশ্রম নিরসন নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেই। আর এই বিষয় নিয়ে তেমন কোনও আলাপ-আলোচনাও নেই। বেসরকারি সংস্থার অনুদান না থাকায় কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ার উদাহরণ টেনে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, গ্রামের শিশুকে গ্রামেই ধরে রেখে খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা দিতে হবে। আর তা না পারলে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে না। যে কারণে সরকারি-বেসরকারি কোনও কার্যকর উদ্যোগই দু’বছরেও দৃশ্যমান হয়নি।
২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধে সরকারের আইন থাকলেও দেশেরকোন খাতে কত শিশুশ্রমিক কাজ করছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
কর্মজীবী নারী’র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সানিজদা সুলতানা বলেন, আমাদের ফোরাম থেকে গতকালকেই নারায়ণগঞ্জ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হয়। তারা তখনও বলছে কোন শিশু কাজ করে না। যারা কাজ করে তারা কিশোর। যেহেতু শ্রম আইনে বিশেষ ব্যবস্থায় বলা হয়, কিছু শর্ত সাপেক্ষে কিশোররা কাজ করতে পারে, এখন কিশোর সাজানো হচ্ছে। গণমাধ্যমে আমরা শুনছিলাম মালিক এর দায় নিবে না। কেবল মালিক কেন, কারখানা পরিদর্শনের দায়িত্ব যাদের তাদেরকেও দায় নিতে হবে। এখন এই দাবি তোলার সময় হয়েছে।
শিশু অধিকারকর্মী গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বাংলাদেশ শিশু আইনে ১৮ আর শ্রম আইনে ১৬ বছরের শিশুরা কাজে যোগদিতে পারবে বলে সুযোগ নেওয়া হয় কিন্তু ১৪ বছরের সেই শিশু কাজে যোগ দিতে পারবে যাকে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসক শারীরিকভাবেকাজে সক্ষম বলে সনদ দিবে। এসব কোন নিয়মই মানা হয় না। যে ঝুকিপূর্ণ ৩৮ কাজের তালিকা আছে তার অন্তত চারটি এইকারখানায় সরাসরি ভায়োলেট করা হয়েছে। এসব মনিটরিং করার কি কেউ নেই? তিনি বলেন, কারখানায় শিশু মারা যাওয়ারপরে আমরা জানতে পারবো সেখানে শিশু ছিল এটা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রশ্ন।
শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান ঘটনার পরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, কারখানাটি শিশু শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, তবে মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।