শীতের শুরুতেই রাজধানীর অনেক ঘরে সরকারি পাইপলাইনের গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে পাইপলাইন গ্যাসের ঘাটতি, অন্যদিকে এলপিজির বাড়তি দাম গ্রাহকদের দিশাহারা করে তুলেছে। রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় সরকারি গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস কোম্পানি। তাদের তথ্য অনুযায়ী দৈনিক প্রয়োজন ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু তারা পাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এদিকে ঢাকায় একযোগে একাধিক কারিগরি সমস্যার কারণে গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ তৈরি হয়েছে। ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, গাবতলী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় নেই বললেই চলে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মিরপুর রোডে গণভবনের সামনে বিতরণ লাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাল্ভ ফেটে যাওয়ার পাশাপাশি তুরাগ নদীর তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনে পানি ঢুকে পড়ায় এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। শনিবার সকালে তিতাস গ্যাসের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মিরপুর রোডে গণভবনের সম্মুখে চার ইঞ্চি ব্যাসের একটি ভাল্ভ হঠাৎ ফেটে গিয়ে বড় ধরনের লিকেজ সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিতরণ নেটওয়ার্কের একাধিক ভাল্ভ সাময়িকভাবে বন্ধ করে গ্যাসের চাপ সীমিত করা হয়। এর ফলেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ দেখা দেয়। পরে অবশ্য ভাল্ভটি প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার মিলছে না আবার পাইপলাইনের গ্যাসেও স্বল্পচাপ। এই দুই নিয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা। কিন্তু রান্না তো করতেই হবে। তাই বিকল্প হিসেবে মাটির চুলা বেছে নিচ্ছেন কেউ, কেউ খুঁজে নিচ্ছেন বৈদ্যুতিক চুলা।
বলা বাহুল্য, গ্যাসের এই সংকটের সময় মাটির চুলা তৈরি যেমন বেড়েছে, তেমনি দোকানে বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা। গ্যাসসংকটে নাকাল নগরজীবন। রাজধানীতে বাসাবাড়ি ও সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের সংকট দিনকে দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। জ্বলছে না চুলা। ঘুরছে না গাড়ির চাকা। গ্যাসসংযোগ থাকা সত্ত্বেও নগরবাসীকে ন্যূনতম জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য গ্যাস সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা এমনকি মাটির চুলা ও কাঠের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হচ্ছে। গৃহবধূদের ক্ষুব্ধ উক্তি প্রাপ্য গ্যাসের ১০ ভাগও না পেয়ে মাসে মাসে গুনতে হচ্ছে গ্যাসলাইনের নির্ধারিত বিল। রাত জেগে পাহারা দিতে হচ্ছে-কখন গ্যাস আসে! এর সুষ্ঠু বিহিত হওয়া উচিত। প্রকাশিত খবরের তথ্য, শীতে গ্যাসের চাপ প্রতি বছরই কমে যায়। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার্ভিস লাইন নির্মাণকাজ এবং দুর্ঘটনায় গ্যাস বিতরণের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এ ছাড়া অতিসম্প্রতি বাজারে সিলিন্ডারেরও সংকট চলছে। সব মিলে পরিস্থিতি শোচনীয়। কর্তৃপক্ষ দ্রুত অবস্থা স্বাভাবিক করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আশা করছে, সহসাই সংকট উত্তরণ সম্ভব হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এক দশক ধরেই দেশে গ্যাসসংকট চলছে। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় সম্প্রতি এটা বেড়ে গেছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ ঘাটতি থেকে উত্তরণে সাগর এবং স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমান গ্যাস-চাহিদার অর্ধেকের বেশি সরবরাহ করতে পারছে না সরকার। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে হচ্ছে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। রান্নার চুলাই জ্বলছে না। ধুঁকে ধুঁকে চলছে শিল্পকারখানা। কিন্তু সিস্টেম লসের নামে গ্যাস চুরি থামছে না। চুরি বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপও চোখে পড়ে না। কারা, কেন এদের পোষে? বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা এবং প্রকৃত সংকট বা ত্রুটি চিহ্নিত করে সুচিন্তিত সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং তা বাস্তবায়ন করা কর্তৃপক্ষের অবশ্যকর্তব্য-দায়িত্ব। ভোক্তারা কোনো অজুহাত-আশ্বাস শুনতে চায় না। তারা চায়- দরকারে তার চুলাটা জ্বলুক, শিল্পোৎপাদন বাধাগ্রস্ত না হোক এবং গাড়ির চাকা ঘুরুক। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পেশাগত অঙ্গীকার ও নৈতিক কর্তব্য। আমাদের প্রত্যাশা, গ্যাস সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন সংশ্লিষ্টরা।























