ঢাকা ০৫:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

৯০ ডিগ্রি বাঁকা ঘাড়, পাকিস্তানি কিশোরীর জীবন পাল্টে দিলেন ভারতীয় চিকিৎসক

  • আপডেট সময় : ১১:৪৫:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ জুলাই ২০২২
  • ১৬১ বার পড়া হয়েছে

প্রত্যাশা ডেস্ক : ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছিল পাকিস্তানি কিশোরী আফশিন গুল। স্বাভাবিক মানুষের মতো কথা বলতে পারা, হাঁটতে পারার মতো অবস্থায় আসতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১২ বছর।
এখন সে ১৩ বছরের কিশোরী। কিন্তু শৈশবে একটি দুর্ঘটনা তার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিয়েছিল। ১০ মাস বয়সে বোনের কোল থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিল তার ঘাড়। এরপর থেকেই আফশিনের ঘাড় পুরো ৯০ ডিগ্রি বেঁকে যায়।
আফশিনকে তার বাবা-মা চিকিৎসকের কাছেও নিয়েছিলেন। চিকিৎসক তাকে কিছু ওষুধ এবং গলায় পরে থাকার জন্য বেল্ট দেন। গলা সোজা রাখার জন্য আফশিনকে সব সময় এই বেল্ট পরে থাকতে হত। কিন্তু এতেও সমস্যা কমেনি। আফশিন সেরিব্রাল পালসিতেও আক্রান্ত ছিল। ছয় বছর বয়সে সে হাঁটা শেখে এবং আট বছর বয়সে কথা বলা। এসব কারণে তার বয়সী শিশুদের তুলনায় সে অনেক পিছিয়েও পড়েছিল। অবশেষে তার জীবন পাল্টে দিয়েছে ভারতীয় একজন চিকিৎসকের অস্ত্রোপচার।
বিবিসি ঊর্দূর রিয়াজ সোহাইলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দিল্লিতে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের এই কিশোরীর জীবন বদলে দেওয়া চিকিৎসা লাভের সেই পথপরিক্রমা:
আফশিন গুলরা সাত ভাই-বোন। তাদের মধ্যে সে সবার ছোট। তার মতো বয়সের বেশিরভাগ শিশুই স্কুলের সহপাঠী কিংবা আশেপাশের খেলার সাথীদের সঙ্গে হেসে-খেলে বড় হয়। কিন্তু আফশিনের কখনও স্কুলে যাওয়া হয়নি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা হয়নি।
করাচি থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে মিথির বাড়িতেই কেটেছে আফশিনের কষ্টের ১২ টি বছর। মেয়ের কথা বলেতে গিয়ে আফশিসিনের মা জামিলান বিবি ফিরে যান সেই অতীতে।

কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ভাল চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য ছিল না। আফশিন হাঁটতে, খেতে, কিংবা কথাও বলতে পারত না। কেবল মাটিতে শুয়ে থাকত। আফশিনের সব কাজ অন্যদের করে দিতে হত।
অবশেষে গত মার্চে আফশিনের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ভারতীয় একজন চিকিৎসক বিনা পয়সায় আফশিনের ঘাড়ে সফল অস্ত্রোপচার করেন। সেই চিকিৎসকের নাম রাজাগোপালন কৃষ্ণান। দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালের জটিল স্পাইনাল সার্জারি বিশেষজ্ঞ তিনি।
অস্ত্রোপচারের পর চার মাস হতে চলল। আফশিন হাঁটতে পারছে, কথা বলতে পারছে, খেতেও পারছে। অস্ত্রোপচারের ক্ষতও শুকিয়ে এসেছে। চিকিৎসক কৃষ্ণান প্রতি সপ্তাহে তাকে স্কাইপে দেখেন।
আফশিনের ভাই ইয়াকুব কুমবার জানান, “সে এখনও কিছুটা দুর্বল…স্কুলে যাওয়ার মতো অবস্থা আফশিনের এখনও হয়নি। তবে চিকিৎসক বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থার উন্নতি হবে। আমরা অনেক খুশি…চিকিৎসক আমার বোনের জীবন বাঁচিয়েছেন। আমাদের জন্য তিনি ফেরেশতা।”
আফশিন কী ধরনের সমস্যায় ভুগছিল তা ব্যাখ্যা করে চিকিৎসক কৃষ্ণান জানান, তার ঘাড়ের কাছে মেরুদ-ের ওপরের হাড় ভেঙেছিল, এতে ঘাড় ঘোরানো যায় না। বিশ্বে এমন ঘটনা সম্ভবত এটি প্রথম বলে জানান তিনি।
২০১৭ সালে আফশিনকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল একটি নিউজ ওয়েবসাইট। সেই প্রতিবেদন অনেকের নজর কাড়ে। পাকিস্তানের নামকরা অভিনেতা আহসান খান নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে আফশিনের ছবি পোস্ট করে সবাইকে শিশুটির সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
আফশিনের মাকেও সনম বালোচের উপস্থাপনায় জনপ্রিয় একটি মনিং শোতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের একজন সংগঠক আফশিনের পরিবারকে অস্ত্রোপচারের খরচ বহনে সহায়তা করতে অনলাইন তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা করে।
২০১৭ সালেরই নভেম্বরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) এমপি নাজ বালোচ আফশিনকে নিয়ে এক টুইটে বলেন, সিন্ধু প্রদেশ সরকার আফশিনের চিকিৎসার দায়িত্ব বহন করবে।
আফশিনের ভাই ইয়াকুব কুমবার জানান, এরপর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বেসরকারি হাসপাতাল আগা খান ইউনিভার্সিটি হসপিটালে আফশিনকে ভর্তি করা হয়। বিশেষজ্ঞরা তখন বলেছিলেন, তারা অস্ত্রোপচার করবেন। কিন্তু আফশিনের বাঁচার আশা ৫০ শতাংশ। এ কথা শুনে আফসিনের মা–বাবা আরেকটু ভেবে দেখবেন বলে আফশিনকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু এরপর তারা আফশিনের এক বোনের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে চিকিৎসার জন্য আর যাওয়া হয়নি। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা আবার সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে হতাশ হন।
এমপি নাজ বালোচ জানান, তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বিদেশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তা নেওয়ার জন্য কাজ করেন। বিদেশি এনজিও আফশিনের পরিবারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার পরই বালোচ এ প্রচেষ্টায় ক্ষ্যান্ত দিয়েছিলেন।
২০১৯ সালে আবার খবরের শিরোনাম হন আফশিন। যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক আলেকজান্দ্রিয়া থমাস আফশিনের অবস্থা ও তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এই থমাসই পরিবারটিকে দিল্লির চিকিৎসক কৃষ্ণানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন এবং কৃষ্ণান আফশিনকে সহায়তা করার আশ্বাস দেন। এরপর বেসরকারি শিশুসেবা সংস্থা দারুল সুকুনের সহায়তায় আফশিনের পরিবার গত বছর নভেম্বরে চিকিৎসা ভিসায় ভারতে যায়। আফশিনের ভাইয়ের কথায়, ওই সময়টা তাদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। কারণ, চিকিৎসক কৃষ্ণান বলেছিলেন, অস্ত্রোপচারের সময় আশফিনের হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, আর্থিক সংকটও ছিল। আফশিনের পরিবারের চিকিৎসার খরচ মেটানোর পয়সা ছিল না। তাই তারা অনলাইনে তহবিল সংগ্রহ করে খরচ মেটানোর ওপরই নির্ভর করে ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসক কৃষ্ণান তাদেরকে ভরসা দেন। তার চেষ্টা ও তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচার সফল হয়।
ঘাড়ে মূল অস্ত্রোপচারের আগে আফশিনের বড় ধরনের দুটি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। এরপর আরও একটি বড় অস্ত্রোপচার হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে মূল অস্ত্রোপচারটি করা হয়।
কৃষ্ণান বিবিসি-কে বলেন, “তিনি ও তার দল ছয় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আফশিনের মাথার খুলির সঙ্গে মেরুদ-কে জোড়া লাগাতে পেরেছিলেন। তারপর ঘাড় সোজা রাখতে কাঠি এবং স্ক্রু ব্যবহার করে মাথার খুলিটিকে সার্ভিক্যাল মেরুদ-ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।”
অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার পর চিকিৎসক কৃষ্ণান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, চিকিৎসা না হলে আফশিন বেশি দিন বাঁচতো না। কিন্তু ‘‘এখন আফশিন হাসছে, কথা বলছে,” সম্প্রতি ঈদুল আযহার আগে ফেইসবুকে বোনের হাস্যোজ্জ্বল একটি ছবি পোস্ট করে ইয়াকুব লিখেছেন এমন কথাই। এখনও অবশ্য আফশিনের কিছু জটিলতা আছে। অন্য শিশুদের তুলনায় সে কিছুটা ধীরগতির। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার উন্নতি হবে বলেই আশ্বস্ত করেছেন চিকিৎসক। আপাতত আফশিন যে বেঁচে আছে, হাসিখুশি আছে, তাতেই আনন্দিত তার পরিবার।

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

৯০ ডিগ্রি বাঁকা ঘাড়, পাকিস্তানি কিশোরীর জীবন পাল্টে দিলেন ভারতীয় চিকিৎসক

আপডেট সময় : ১১:৪৫:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ জুলাই ২০২২

প্রত্যাশা ডেস্ক : ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছিল পাকিস্তানি কিশোরী আফশিন গুল। স্বাভাবিক মানুষের মতো কথা বলতে পারা, হাঁটতে পারার মতো অবস্থায় আসতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১২ বছর।
এখন সে ১৩ বছরের কিশোরী। কিন্তু শৈশবে একটি দুর্ঘটনা তার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিয়েছিল। ১০ মাস বয়সে বোনের কোল থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিল তার ঘাড়। এরপর থেকেই আফশিনের ঘাড় পুরো ৯০ ডিগ্রি বেঁকে যায়।
আফশিনকে তার বাবা-মা চিকিৎসকের কাছেও নিয়েছিলেন। চিকিৎসক তাকে কিছু ওষুধ এবং গলায় পরে থাকার জন্য বেল্ট দেন। গলা সোজা রাখার জন্য আফশিনকে সব সময় এই বেল্ট পরে থাকতে হত। কিন্তু এতেও সমস্যা কমেনি। আফশিন সেরিব্রাল পালসিতেও আক্রান্ত ছিল। ছয় বছর বয়সে সে হাঁটা শেখে এবং আট বছর বয়সে কথা বলা। এসব কারণে তার বয়সী শিশুদের তুলনায় সে অনেক পিছিয়েও পড়েছিল। অবশেষে তার জীবন পাল্টে দিয়েছে ভারতীয় একজন চিকিৎসকের অস্ত্রোপচার।
বিবিসি ঊর্দূর রিয়াজ সোহাইলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দিল্লিতে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের এই কিশোরীর জীবন বদলে দেওয়া চিকিৎসা লাভের সেই পথপরিক্রমা:
আফশিন গুলরা সাত ভাই-বোন। তাদের মধ্যে সে সবার ছোট। তার মতো বয়সের বেশিরভাগ শিশুই স্কুলের সহপাঠী কিংবা আশেপাশের খেলার সাথীদের সঙ্গে হেসে-খেলে বড় হয়। কিন্তু আফশিনের কখনও স্কুলে যাওয়া হয়নি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা হয়নি।
করাচি থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে মিথির বাড়িতেই কেটেছে আফশিনের কষ্টের ১২ টি বছর। মেয়ের কথা বলেতে গিয়ে আফশিসিনের মা জামিলান বিবি ফিরে যান সেই অতীতে।

কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ভাল চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য ছিল না। আফশিন হাঁটতে, খেতে, কিংবা কথাও বলতে পারত না। কেবল মাটিতে শুয়ে থাকত। আফশিনের সব কাজ অন্যদের করে দিতে হত।
অবশেষে গত মার্চে আফশিনের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ভারতীয় একজন চিকিৎসক বিনা পয়সায় আফশিনের ঘাড়ে সফল অস্ত্রোপচার করেন। সেই চিকিৎসকের নাম রাজাগোপালন কৃষ্ণান। দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালের জটিল স্পাইনাল সার্জারি বিশেষজ্ঞ তিনি।
অস্ত্রোপচারের পর চার মাস হতে চলল। আফশিন হাঁটতে পারছে, কথা বলতে পারছে, খেতেও পারছে। অস্ত্রোপচারের ক্ষতও শুকিয়ে এসেছে। চিকিৎসক কৃষ্ণান প্রতি সপ্তাহে তাকে স্কাইপে দেখেন।
আফশিনের ভাই ইয়াকুব কুমবার জানান, “সে এখনও কিছুটা দুর্বল…স্কুলে যাওয়ার মতো অবস্থা আফশিনের এখনও হয়নি। তবে চিকিৎসক বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থার উন্নতি হবে। আমরা অনেক খুশি…চিকিৎসক আমার বোনের জীবন বাঁচিয়েছেন। আমাদের জন্য তিনি ফেরেশতা।”
আফশিন কী ধরনের সমস্যায় ভুগছিল তা ব্যাখ্যা করে চিকিৎসক কৃষ্ণান জানান, তার ঘাড়ের কাছে মেরুদ-ের ওপরের হাড় ভেঙেছিল, এতে ঘাড় ঘোরানো যায় না। বিশ্বে এমন ঘটনা সম্ভবত এটি প্রথম বলে জানান তিনি।
২০১৭ সালে আফশিনকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল একটি নিউজ ওয়েবসাইট। সেই প্রতিবেদন অনেকের নজর কাড়ে। পাকিস্তানের নামকরা অভিনেতা আহসান খান নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে আফশিনের ছবি পোস্ট করে সবাইকে শিশুটির সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
আফশিনের মাকেও সনম বালোচের উপস্থাপনায় জনপ্রিয় একটি মনিং শোতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের একজন সংগঠক আফশিনের পরিবারকে অস্ত্রোপচারের খরচ বহনে সহায়তা করতে অনলাইন তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা করে।
২০১৭ সালেরই নভেম্বরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) এমপি নাজ বালোচ আফশিনকে নিয়ে এক টুইটে বলেন, সিন্ধু প্রদেশ সরকার আফশিনের চিকিৎসার দায়িত্ব বহন করবে।
আফশিনের ভাই ইয়াকুব কুমবার জানান, এরপর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বেসরকারি হাসপাতাল আগা খান ইউনিভার্সিটি হসপিটালে আফশিনকে ভর্তি করা হয়। বিশেষজ্ঞরা তখন বলেছিলেন, তারা অস্ত্রোপচার করবেন। কিন্তু আফশিনের বাঁচার আশা ৫০ শতাংশ। এ কথা শুনে আফসিনের মা–বাবা আরেকটু ভেবে দেখবেন বলে আফশিনকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু এরপর তারা আফশিনের এক বোনের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে চিকিৎসার জন্য আর যাওয়া হয়নি। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা আবার সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে হতাশ হন।
এমপি নাজ বালোচ জানান, তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বিদেশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তা নেওয়ার জন্য কাজ করেন। বিদেশি এনজিও আফশিনের পরিবারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার পরই বালোচ এ প্রচেষ্টায় ক্ষ্যান্ত দিয়েছিলেন।
২০১৯ সালে আবার খবরের শিরোনাম হন আফশিন। যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক আলেকজান্দ্রিয়া থমাস আফশিনের অবস্থা ও তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এই থমাসই পরিবারটিকে দিল্লির চিকিৎসক কৃষ্ণানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন এবং কৃষ্ণান আফশিনকে সহায়তা করার আশ্বাস দেন। এরপর বেসরকারি শিশুসেবা সংস্থা দারুল সুকুনের সহায়তায় আফশিনের পরিবার গত বছর নভেম্বরে চিকিৎসা ভিসায় ভারতে যায়। আফশিনের ভাইয়ের কথায়, ওই সময়টা তাদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। কারণ, চিকিৎসক কৃষ্ণান বলেছিলেন, অস্ত্রোপচারের সময় আশফিনের হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, আর্থিক সংকটও ছিল। আফশিনের পরিবারের চিকিৎসার খরচ মেটানোর পয়সা ছিল না। তাই তারা অনলাইনে তহবিল সংগ্রহ করে খরচ মেটানোর ওপরই নির্ভর করে ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসক কৃষ্ণান তাদেরকে ভরসা দেন। তার চেষ্টা ও তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচার সফল হয়।
ঘাড়ে মূল অস্ত্রোপচারের আগে আফশিনের বড় ধরনের দুটি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। এরপর আরও একটি বড় অস্ত্রোপচার হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে মূল অস্ত্রোপচারটি করা হয়।
কৃষ্ণান বিবিসি-কে বলেন, “তিনি ও তার দল ছয় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আফশিনের মাথার খুলির সঙ্গে মেরুদ-কে জোড়া লাগাতে পেরেছিলেন। তারপর ঘাড় সোজা রাখতে কাঠি এবং স্ক্রু ব্যবহার করে মাথার খুলিটিকে সার্ভিক্যাল মেরুদ-ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।”
অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার পর চিকিৎসক কৃষ্ণান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, চিকিৎসা না হলে আফশিন বেশি দিন বাঁচতো না। কিন্তু ‘‘এখন আফশিন হাসছে, কথা বলছে,” সম্প্রতি ঈদুল আযহার আগে ফেইসবুকে বোনের হাস্যোজ্জ্বল একটি ছবি পোস্ট করে ইয়াকুব লিখেছেন এমন কথাই। এখনও অবশ্য আফশিনের কিছু জটিলতা আছে। অন্য শিশুদের তুলনায় সে কিছুটা ধীরগতির। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার উন্নতি হবে বলেই আশ্বস্ত করেছেন চিকিৎসক। আপাতত আফশিন যে বেঁচে আছে, হাসিখুশি আছে, তাতেই আনন্দিত তার পরিবার।