ঢাকা ০৪:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৬ সাল: নতুন বছরে মানুষ কী চায়

  • আপডেট সময় : ০৮:২৮:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

ইরাজ আহমেদ

নতুন বছরে মানুষ কী চায়? আরো ভেঙে বললে, এই ক্রান্তীয় সূর্যের দেশের মানুষ কী চেয়েছে? সেই সে কবে এই পদ্মা-মেঘনা-যমুনার তীরে মানুষ সংসার ছড়িয়ে বসেছিল; নরম পলির ভেতরে লাঙলের ফলা টেনে শস্যকণা ছড়িয়ে দিয়েছিল; দুই বেলা দুই মুঠো ভাতের স্বপ্নকে পল্লবিত করতে চেয়েছিল। হ্যাঁ, তারা স্বপ্ন ছড়াতে চেয়েছিল। চেয়েছিল স্বপ্ন সফল হোক; চেয়েছিল সন্তানসন্ততিরা বাঁচুক নিরাপদে।

মানুষ জীবনের প্রতি তার আগ্রহের কারণে সমাজ গঠন করে। নিজের নিঃসঙ্গ নির্মাণের বৃত্ত ভেঙে সমষ্টির নির্মাণে ব্রতী হয়। তৈরি হয় একটি সমাজ। মাঝেমধ্যেই মনের মধ্যে প্রশ্নের উদয় হয়, ‘সমাজ কী আসলে?’ শুধু কিছু মানুষের যোগফলে তো একটি সমাজ গঠিত হয় না। সমাজ মানে শুধু ভৌগোলিক জনগোষ্ঠী নয়। বরং বলা যেতে পারে এটি জৈবিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক কাঠামো। বহুদিন ধরে মানুষের জীবনধারা, অধীত বিদ্যা, সংস্কৃতিচর্চা, অভ্যাস, আচরণ, ভালো-মন্দের বিচারের ভেতর দিয়েই একটি সমাজ গড়ে ওঠে। সেখানে মানুষের আশা, স্বপ্ন বিকশিত হয়ে উঠতে থাকে।

একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রটি তার নিজের জন্মবৃত্তান্ত জানান দেয়। শুরু হয় নতুন সময়, সমাজ ও মনুষ্যত্বের সন্ধান। কাজটি তখনও সহজ ছিল না। এখনও সহজ হয়ে ওঠেনি। মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাই একটি সমাজ তৈরির ভিত হিসেবে কাজ করে। মানুষের এগিয়ে চলার অদম্য বাসনা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় নিয়ে যায়?

সমাজ যাত্রার কোনো শেষ বিন্দু নেই। সে কেবল আপন নিয়মে এগিয়ে চলে। পর্যায় বদল করে একটি রূপ থেকে আরেকটি রূপে উপনীত হয়। সেখানে সাম্য, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সেতু, তাদের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা কি সেই ব্রত যাত্রায় নিজেদের যথার্থভাবে যুক্ত করতে পেরেছি?

আমরা রাজনৈতিক ও মানসিক বৈষম্যে ভোগা জাতি। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা সমাজের নানামুখী বিকাশ, নানা জাতি-ধর্মের মানুষের সংস্কৃতিকে মিলিয়ে আপন করে নিতে পারিনি। এই মিলনের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সব মানুষের দর্শনের সঙ্গে যে এই কথায় মেরুদূর প্রভেদ আছে, সেটি বুঝতে অনেক জ্ঞান ক্ষয় করতে হয় না। কিন্তু কি একেবারে চোখ বন্ধ করে এই উপলব্ধিকে ভুল অথবা বিভ্রান্তিকর বলে বিদায় করতে পারব?

ক্ষমতার মোহন পারদ বল আপন আপন মুঠোয় বন্দি করার যে যুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অবতীর্ণ, তা থেকে দেশের মানুষ ও সমাজের চাওয়া-পাওয়ার দূরত্ব অনেক। একটি কথা প্রচলিত- শাসক কখনো অদৃশ্য কালিতে লেখা দেয়াল লিখন পাঠ করে না। আবার শাসকদের বিরোধী পক্ষরাও কি সমাজের মানুষের অব্যক্ত কথা অনুধাবনে সক্ষম? এক দল ক্ষমতার সিংহাসন রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, অন্যরা সিংহাসন পর্যন্ত পৌঁছানোর পথের খোঁজ করে।

বলা হয়, চূড়ান্ত ক্ষমতা সবকিছুকে দুর্বৃত্তায়নের দিকে ঠেলে দেয়। পচন ধরে সমাজে, মানুষের মনে। মানুষে মানুষে পারস্পরিক বোঝাপড়ার সূত্রগুলো ক্ষয় হয়ে যেতে শুরু করে। কথাগুলো রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মানুষের কাছে তেতো ঠেকতে পারে, কিন্তু সত্য তো তিক্তই হয়। এই প্রক্রিয়া মানুষের মনোজগতে তৈরি করে বৈষম্য। তাদের চিন্তার জগৎ নেতিবাচক ধারণায় আচ্ছন্ন হয়; পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস আর প্রতিহিংসা অন্ধ দানবের মতো তাড়া করে ফেরে। তাতে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে।

সমাজ কি শুধুই রাজনীতির জটিল পাশা খেলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার মূল বুননগুলো হারাতে বসে? অভিযোগের আঙুল রাজনীতির দিকে তাক করা থাকলেও অন্য উপকরণগুলোও তাদের বিষাক্ত নিঃসরণ ঘটিয়ে সমাজকে অনুৎপাদনশীল, অজ্ঞানতার কুয়ার দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে। মানুষ বুঝতে পারে না– কখন তার সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। সমাজের ভেতরে জ্ঞানের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা শুধু তথ্যের প্রবাহকে সঞ্চয় করে; ভিন্ন ধর্মের মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তারই স্বজাতি, যখন লোভ আর হিংসা উদারতার স্থান দখল করে; খুন হওয়া মানবিকতার শরীর পড়ে থাকে চলতি পথের পাশে কোনো জঙ্গলে, তখন একটি সমাজের ভাগ্যে পতনের ভবিষ্যদ্বাণী লেখা হয়ে যায়।

শুরুতেই বলেছিলাম, এই ক্রান্তীয় সূর্যের দেশের মানুষ আসলে কী চেয়েছে? উত্তরে বলা যায়, এ দেশের মানুষ খুব সাধারণভাবে বাঁচতে চেয়েছে। ফসলের নিষ্কণ্টক উৎপাদনে, জীবনের প্রয়োজনে মাঠে আর বন্দরে শ্রম দিয়ে, উৎসব-পার্বণে সবাই একসঙ্গে উদযাপনের মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ সমাজ তৈরির স্বপ্ন দেখেছে। এই স্বপ্ন দেখার জন্য কি খুব বড় যজ্ঞের আয়োজন প্রয়োজন?

দেশের মানুষ বহুরূপী নয়; অভিনেতাও নয়। ছাপোষা নিতান্ত সাধারণ মানুষ। অভিনয়ের কাজটা তার স্বভাবে নেই। বহুরূপীর সাজসজ্জাও তাদের নাগালের বাইরে। তারা শুধু তাদের সামান্য স্বপ্ন নাড়াচাড়া করে একটা জীবন অপ্রাপ্তির দুয়ারে অর্ঘ্য দিয়ে ফুরিয়ে যায়। কিন্তু তাদের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা তো জটিল কিংবা দুর্বোধ্য নয়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায় তারা কী চেয়েছে এবং কী পেয়েছে। এ দেশের ভাগ্যের সঙ্গে এই মানুষের ভাগ্য জড়িত। সব উত্থান-পতনে তারা ছিল সঙ্গী। এসব মানুষ ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে; পতাকা বদল করেছে। তাদের এই ধারাবাহিক সংগ্রামের কাহিনি ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। তারা তো দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তুলে ধরেছে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার কথা। প্রতিটি পরিবর্তনের বাঁকে সে চেয়েছে সবার ভাগ্যের পরিবর্তন- মাটির তলায় ট্রেন, গ্রহান্তরে পাড়ি দেওয়ার যান এখনই হাতের মুঠোয় পাওয়ার দাবি মানুষ কখনও করেনি। তাদের চাওয়া খুব সাদামাটা। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কি পরিবর্তন ঘটেছে?

এই যে একটি স্বাধীন দেশের মানুষ সমতার ভিত্তিতে গঠিত হওয়ার স্বপ্নে অগ্রসর হতে চেয়েছে; স্বপ্নের কথা কি কেউ জানতে চেয়েছে তাদের কাছে গিয়ে? এখানেই বোধ হয় তৈরি হয়েছে প্রতারণার বড় ফাঁদ। এই যুগ বঞ্চনার যুগ। মানুষকে সার্কাসের ক্লাউন সাজিয়ে সুবিধাভোগীদের স্বার্থ উদ্ধারের যুগ।

এই সমাজের মানুষ কখনো বলতে পারল না- পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার চাই, রোজগারের নিশ্চয়তা চাই, শিক্ষার অধিকার চাই, চিকিৎসার নিশ্চয়তা চাই, বাঁচার অধিকার চাই। আমরা যারা সমাজের মানুষের ভাতের অধিকারের কথা লিখে চলি, তারাও তাদের একটি ঘেরাটোপে বন্দি করে রাখতে চাই। সমাজবদ্ধ মানুষের আরো প্রাপ্তি আছে, আরো চাওয়া আছে; অধিকারের বাস্তবায়ন আছে।

মানুষ কোনো নদীতীরে, শহরের খুপরি ঘরে অথবা উদাম ফুটপাতে স্বপ্ন হাতের মুঠোয় নিয়ে চিরকালের এক পিকনিক করতে এসেছে যেন। আমাদের সভ্যতার অক্লান্ত নির্মাতা এই আমাদের ডানে-বামে অগণিত মানুষ। তারা লড়াই করতে ও টিকে থাকতে জানে। সেই তার লড়াই। সেই তার অফুরান জয়যাত্রা।

ইরাজ আহমেদ: কবি
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

২০২৬ সাল: নতুন বছরে মানুষ কী চায়

আপডেট সময় : ০৮:২৮:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

ইরাজ আহমেদ

নতুন বছরে মানুষ কী চায়? আরো ভেঙে বললে, এই ক্রান্তীয় সূর্যের দেশের মানুষ কী চেয়েছে? সেই সে কবে এই পদ্মা-মেঘনা-যমুনার তীরে মানুষ সংসার ছড়িয়ে বসেছিল; নরম পলির ভেতরে লাঙলের ফলা টেনে শস্যকণা ছড়িয়ে দিয়েছিল; দুই বেলা দুই মুঠো ভাতের স্বপ্নকে পল্লবিত করতে চেয়েছিল। হ্যাঁ, তারা স্বপ্ন ছড়াতে চেয়েছিল। চেয়েছিল স্বপ্ন সফল হোক; চেয়েছিল সন্তানসন্ততিরা বাঁচুক নিরাপদে।

মানুষ জীবনের প্রতি তার আগ্রহের কারণে সমাজ গঠন করে। নিজের নিঃসঙ্গ নির্মাণের বৃত্ত ভেঙে সমষ্টির নির্মাণে ব্রতী হয়। তৈরি হয় একটি সমাজ। মাঝেমধ্যেই মনের মধ্যে প্রশ্নের উদয় হয়, ‘সমাজ কী আসলে?’ শুধু কিছু মানুষের যোগফলে তো একটি সমাজ গঠিত হয় না। সমাজ মানে শুধু ভৌগোলিক জনগোষ্ঠী নয়। বরং বলা যেতে পারে এটি জৈবিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক কাঠামো। বহুদিন ধরে মানুষের জীবনধারা, অধীত বিদ্যা, সংস্কৃতিচর্চা, অভ্যাস, আচরণ, ভালো-মন্দের বিচারের ভেতর দিয়েই একটি সমাজ গড়ে ওঠে। সেখানে মানুষের আশা, স্বপ্ন বিকশিত হয়ে উঠতে থাকে।

একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রটি তার নিজের জন্মবৃত্তান্ত জানান দেয়। শুরু হয় নতুন সময়, সমাজ ও মনুষ্যত্বের সন্ধান। কাজটি তখনও সহজ ছিল না। এখনও সহজ হয়ে ওঠেনি। মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাই একটি সমাজ তৈরির ভিত হিসেবে কাজ করে। মানুষের এগিয়ে চলার অদম্য বাসনা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় নিয়ে যায়?

সমাজ যাত্রার কোনো শেষ বিন্দু নেই। সে কেবল আপন নিয়মে এগিয়ে চলে। পর্যায় বদল করে একটি রূপ থেকে আরেকটি রূপে উপনীত হয়। সেখানে সাম্য, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানুষের মধ্যে সম্পর্কের সেতু, তাদের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা কি সেই ব্রত যাত্রায় নিজেদের যথার্থভাবে যুক্ত করতে পেরেছি?

আমরা রাজনৈতিক ও মানসিক বৈষম্যে ভোগা জাতি। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা সমাজের নানামুখী বিকাশ, নানা জাতি-ধর্মের মানুষের সংস্কৃতিকে মিলিয়ে আপন করে নিতে পারিনি। এই মিলনের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সব মানুষের দর্শনের সঙ্গে যে এই কথায় মেরুদূর প্রভেদ আছে, সেটি বুঝতে অনেক জ্ঞান ক্ষয় করতে হয় না। কিন্তু কি একেবারে চোখ বন্ধ করে এই উপলব্ধিকে ভুল অথবা বিভ্রান্তিকর বলে বিদায় করতে পারব?

ক্ষমতার মোহন পারদ বল আপন আপন মুঠোয় বন্দি করার যে যুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অবতীর্ণ, তা থেকে দেশের মানুষ ও সমাজের চাওয়া-পাওয়ার দূরত্ব অনেক। একটি কথা প্রচলিত- শাসক কখনো অদৃশ্য কালিতে লেখা দেয়াল লিখন পাঠ করে না। আবার শাসকদের বিরোধী পক্ষরাও কি সমাজের মানুষের অব্যক্ত কথা অনুধাবনে সক্ষম? এক দল ক্ষমতার সিংহাসন রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, অন্যরা সিংহাসন পর্যন্ত পৌঁছানোর পথের খোঁজ করে।

বলা হয়, চূড়ান্ত ক্ষমতা সবকিছুকে দুর্বৃত্তায়নের দিকে ঠেলে দেয়। পচন ধরে সমাজে, মানুষের মনে। মানুষে মানুষে পারস্পরিক বোঝাপড়ার সূত্রগুলো ক্ষয় হয়ে যেতে শুরু করে। কথাগুলো রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মানুষের কাছে তেতো ঠেকতে পারে, কিন্তু সত্য তো তিক্তই হয়। এই প্রক্রিয়া মানুষের মনোজগতে তৈরি করে বৈষম্য। তাদের চিন্তার জগৎ নেতিবাচক ধারণায় আচ্ছন্ন হয়; পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস আর প্রতিহিংসা অন্ধ দানবের মতো তাড়া করে ফেরে। তাতে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে।

সমাজ কি শুধুই রাজনীতির জটিল পাশা খেলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার মূল বুননগুলো হারাতে বসে? অভিযোগের আঙুল রাজনীতির দিকে তাক করা থাকলেও অন্য উপকরণগুলোও তাদের বিষাক্ত নিঃসরণ ঘটিয়ে সমাজকে অনুৎপাদনশীল, অজ্ঞানতার কুয়ার দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে। মানুষ বুঝতে পারে না– কখন তার সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। সমাজের ভেতরে জ্ঞানের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা শুধু তথ্যের প্রবাহকে সঞ্চয় করে; ভিন্ন ধর্মের মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তারই স্বজাতি, যখন লোভ আর হিংসা উদারতার স্থান দখল করে; খুন হওয়া মানবিকতার শরীর পড়ে থাকে চলতি পথের পাশে কোনো জঙ্গলে, তখন একটি সমাজের ভাগ্যে পতনের ভবিষ্যদ্বাণী লেখা হয়ে যায়।

শুরুতেই বলেছিলাম, এই ক্রান্তীয় সূর্যের দেশের মানুষ আসলে কী চেয়েছে? উত্তরে বলা যায়, এ দেশের মানুষ খুব সাধারণভাবে বাঁচতে চেয়েছে। ফসলের নিষ্কণ্টক উৎপাদনে, জীবনের প্রয়োজনে মাঠে আর বন্দরে শ্রম দিয়ে, উৎসব-পার্বণে সবাই একসঙ্গে উদযাপনের মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ সমাজ তৈরির স্বপ্ন দেখেছে। এই স্বপ্ন দেখার জন্য কি খুব বড় যজ্ঞের আয়োজন প্রয়োজন?

দেশের মানুষ বহুরূপী নয়; অভিনেতাও নয়। ছাপোষা নিতান্ত সাধারণ মানুষ। অভিনয়ের কাজটা তার স্বভাবে নেই। বহুরূপীর সাজসজ্জাও তাদের নাগালের বাইরে। তারা শুধু তাদের সামান্য স্বপ্ন নাড়াচাড়া করে একটা জীবন অপ্রাপ্তির দুয়ারে অর্ঘ্য দিয়ে ফুরিয়ে যায়। কিন্তু তাদের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা তো জটিল কিংবা দুর্বোধ্য নয়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায় তারা কী চেয়েছে এবং কী পেয়েছে। এ দেশের ভাগ্যের সঙ্গে এই মানুষের ভাগ্য জড়িত। সব উত্থান-পতনে তারা ছিল সঙ্গী। এসব মানুষ ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে; পতাকা বদল করেছে। তাদের এই ধারাবাহিক সংগ্রামের কাহিনি ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। তারা তো দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তুলে ধরেছে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার কথা। প্রতিটি পরিবর্তনের বাঁকে সে চেয়েছে সবার ভাগ্যের পরিবর্তন- মাটির তলায় ট্রেন, গ্রহান্তরে পাড়ি দেওয়ার যান এখনই হাতের মুঠোয় পাওয়ার দাবি মানুষ কখনও করেনি। তাদের চাওয়া খুব সাদামাটা। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কি পরিবর্তন ঘটেছে?

এই যে একটি স্বাধীন দেশের মানুষ সমতার ভিত্তিতে গঠিত হওয়ার স্বপ্নে অগ্রসর হতে চেয়েছে; স্বপ্নের কথা কি কেউ জানতে চেয়েছে তাদের কাছে গিয়ে? এখানেই বোধ হয় তৈরি হয়েছে প্রতারণার বড় ফাঁদ। এই যুগ বঞ্চনার যুগ। মানুষকে সার্কাসের ক্লাউন সাজিয়ে সুবিধাভোগীদের স্বার্থ উদ্ধারের যুগ।

এই সমাজের মানুষ কখনো বলতে পারল না- পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার চাই, রোজগারের নিশ্চয়তা চাই, শিক্ষার অধিকার চাই, চিকিৎসার নিশ্চয়তা চাই, বাঁচার অধিকার চাই। আমরা যারা সমাজের মানুষের ভাতের অধিকারের কথা লিখে চলি, তারাও তাদের একটি ঘেরাটোপে বন্দি করে রাখতে চাই। সমাজবদ্ধ মানুষের আরো প্রাপ্তি আছে, আরো চাওয়া আছে; অধিকারের বাস্তবায়ন আছে।

মানুষ কোনো নদীতীরে, শহরের খুপরি ঘরে অথবা উদাম ফুটপাতে স্বপ্ন হাতের মুঠোয় নিয়ে চিরকালের এক পিকনিক করতে এসেছে যেন। আমাদের সভ্যতার অক্লান্ত নির্মাতা এই আমাদের ডানে-বামে অগণিত মানুষ। তারা লড়াই করতে ও টিকে থাকতে জানে। সেই তার লড়াই। সেই তার অফুরান জয়যাত্রা।

ইরাজ আহমেদ: কবি
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ