লাইফস্টাইল ডেস্ক: এক সময় ঈদ বা যে কোনো পারিবারিক আয়োজন মানেই ছিল কাজিনদের ভিড়। খালাতো-ফুফাতো-মামাতো ভাইবোনে বাড়ি গমগম। কার ঘরে কে ঘুমাবে, কে কার কাপড় পরবে, কে আগে গোসল করবে, কে খাবে মুরগির রান- এই নিয়ে কাড়াকাড়ি আর খুনসুটি। আবার বিকেলে একসঙ্গে খেলতে যাওয়া, ধুলামাখা পথে হেঁটে চলা, রাতে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে দাঁতকপাটি, চোর-ডাকাত-পুলিশ খেলতে খেলতে হেসে অজ্ঞান। অনেকের শৈশবের সবচেয়ে জীবন্ত স্মৃতিগুলোর বড় অংশই জড়িয়ে আছে কাজিনদের সঙ্গে। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এখন অনেক পরিবারেই শিশুর কাজিনের সংখ্যা হাতে গোনা। আগের মতো বড় পরিবার, বড় আড্ডা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা ওই প্রবণতাকে বলছেন ‘গ্রেট কাজিন ডিক্লাইন’ অর্থাৎ কাজিন কমে যাওয়ার সময়। কেন কমে যাচ্ছে কাজিন? এতে কী হতে পারে? এর পেছনের কারণ আসলে খুব সাধারণ, সবার জানা- পরিবার ছোট হচ্ছে। আগের প্রজন্মে প্রতি পরিবারে চার-পাঁচ ভাইবোন থাকা ছিল স্বাভাবিক। এখন এক বা দুই সন্তানেই পরিবার সীমাবদ্ধ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কাজিনের সংখ্যাও কমছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরো কিছু বাস্তবতা। তা হলো বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বয়স বাড়ছে; অনেক দম্পতি কম সন্তান বা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন; সন্তান বড় করার খরচ আগের চেয়ে অনেক বেশি; পড়াশোনা, চাকরি আর জীবনের চাপ সামলাতে গিয়ে পরিবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
ভাইবোনের সঙ্গে সম্পর্কটা নির্দিষ্ট- রক্তের সম্পর্ক, রোজকার দেখা, কথাবার্তা, হাসি, ঠাট্টা, ঝগড়া এবং দায়িত্ব-কর্তব্য পালন। বন্ধুত্বের সম্পর্কটা পুরোপুরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এখানে বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে, এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। আর কাজিনদের সঙ্গে সম্পর্কটা এই দুইয়ের মাঝামাঝি- রক্তের সম্পর্ক আছে আবার দৈনন্দিন বাধ্যবাধকতাও নেই। এ কারণেই কাজিনরা অনেক সময় হয়ে ওঠে শৈশবের প্রথম বন্ধু। তারা আপনার পরিবারের নাড়িনক্ষত্র জানে, আবার আপনার ব্যক্তিগত জগৎটাও বোঝে। তারা আপনাকে এমনভাবে চেনে- যেভাবে অনেক বন্ধু বা সহকর্মী কখনোই চিনবে না।
কাজিন কমে গেলে যা হয়, তা হলো শৈশবের যৌথ স্মৃতি কমে যায় বা তৈরি হওয়ার পরিবেশই সৃষ্টি হয় না; পারিবারিক গল্প শোনানোর মানুষ কমে যায়; উৎসব আর মিলনমেলা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে; বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ শূন্যতা অনেক সময় আরো স্পষ্ট হয়;
বয়স বাড়লে কাজিনদের গুরুত্ব বেড়ে যায়। এক সময় আমরা যখন বড়দের দলে চলে যাই। তখন পরিবারের ইতিহাস, পুরোনো সম্পর্ক, আত্মীয়তার সূত্র—এসব ধরে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ে। আর তখনই কাজিনরা অনেক সময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে কাছের মানুষ। কারণ তারা একই স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। একই দাদাবাড়ি, একই নানাবাড়ি, একই গল্প।
ভবিষ্যৎ: না। পরিবার ছোট হলেও সম্পর্কের প্রয়োজন কমেনি, কমবেও না। শুধু রূপ বদলাচ্ছে। অনেকে এখন বন্ধুদেরই পরিবারের অংশ করে নিচ্ছেন। বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ, জন্মদিন, দাওয়াত যাওয়া- এসবই হয়ে উঠছে নতুন ধরনের পরিবার। কেউ কেউ বলছেন, সম্পর্ক এখন আর শুধু রক্তের নয়, পছন্দেরও। তবু একটা সত্য অস্বীকার করা যায় না। তা হলো কাজিনের সঙ্গে সম্পর্কের যে স্বাভাবিকতা, জীবনটাকে যেভাবে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ; সেটি অন্য কোথাও, অন্য কোনো সম্পর্কে পুরোপুরি পাওয়া যায় না। সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ


























