দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন যেভাবে প্রাণহানি ঘটছে, তা কেবল দুর্ঘটনা নয়; বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখে পড়ে স্বজনহারা মানুষের আহাজারি। কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে নয়; বরং সারা দেশেই এখন সড়ক যেন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোয় ভারী যানবাহনের চাপ ও বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পটিয়া, মিরসরাই বা সীতাকুণ্ডের মতো এলাকাগুলোয় নিয়মিত বিরতিতে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা সারা দেশেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের হার বিগত বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়। দেশে শুধু ২০২৫ সালেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭ হাজার ৫৮৪টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত দেশের পাঁচ জেলায় সাতটি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামে দুটি ঘটনায় নৌবাহিনীর এক সদস্যসহ পাঁচজন, মুন্সীগঞ্জে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে দুইজন এবং কুমিল্লায় দুটি ঘটনায় ছয়জন, হবিগঞ্জে দুজন, ঝিনাইদহে পল্লী চিকিৎসকসহ দুইজন, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে একজন ও টাঙ্গাইলে একজন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় শতাধিক ব্যক্তি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ বিদ্যমান। তা হলো অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক। দেশের একটি বড় অংশের চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই। আবার অনেকের লাইসেন্স থাকলেও তারা যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। ফিটনেসবিহীন আর লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িগুলো সড়কে চলাচলের অনুমতি না থাকলেও প্রশাসনের চোখের সামনেই সেগুলো দাপিয়ে বেড়ায়। চালকদের মধ্যে আগে যাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংয়ে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এছাড়া সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং মহাসড়কের পাশে অবৈধ দখলদারিত্বও দুর্ঘটনার বৃদ্ধি করছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের মহানগরীতে ফ্লাইওভার বা প্রধান সড়কগুলোয় অনেক সময় ট্রাফিক সিগন্যালের তোয়াক্কা না করার প্রবণতা দেখা যায়। আবার পথচারীদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব রয়েছে। জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে মাঝরাস্তা দিয়ে পারাপারের ঝুঁকি নিয়ে থাকেন তারা। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল শোক প্রকাশ করলেই চলবে না, প্রয়োজন কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সরকারের উচিত সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
আমরা বলতে চাই, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিআরটিএর তদারকি বৃদ্ধি এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সহীন চালকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি; যাতে ক্লান্ত অবস্থায় কেউ স্টিয়ারিং না ধরেন। এর পাশাপাশি সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটিগুলো দ্রুত সারিয়ে তুলতে এবং মহাসড়কে ছোট ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সড়ক নিরাপদ রাখা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; বরং চালক, মালিক ও পথচারী- সবাকেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
আমরা আর কোনো অকাল মৃত্যু দেখতে চাই না। একটি নিরাপদ সড়ক পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে সড়কে লাশের মিছিল দীর্ঘতর হতেই থাকবে। এটি রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জেগে উঠবে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে জনগণের দীর্ঘদিনের আশা পূরণে আন্তরিক হবে। আমরা প্রত্যাশা, মহাসড়ক-সড়কে দুর্ঘটনা রোধে মানুষ হত্যাকারীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
আজকের প্রত্যাশা/ কেএমএএ


























