ঢাকা ১০:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

শৈত্যপ্রবাহ ‘কনকন’: নামেই যেন কাঁপুনি

  • আপডেট সময় : ০৮:৪২:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

এবারের শীত মৌসুমে প্রথম শৈত্যপ্রবাহ আসছে ‘কনকন’ নাম ধারণ করে। বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের (বিডব্লিউওটি)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ‘এই শৈত্যপ্রবাহ কয়েক দিন ধরে দেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে।’

শীত বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু যে নামটা উচ্চারণ করলেই গায়ে কাঁটা দেয় তা হচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। আর সেটার নাম যদি কনকন হয়তো আর কোনো কথাই নেই! কারণ এই নামের মধ্যেই যেন শীতের কাঁপুনি আর আগুন জ্বালানোর তাড়না লুকিয়ে আছে। কনকন-এর মতো শৈত্যপ্রবাহ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, শীত বাংলাদেশের এমন একটি ঋতু; যা ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে নানা বৈপরীত্য জানান দিতে আসে আর সেটাই অনেকের জন্য এটি এক কঠিন বাস্তবতা।

শহরের মানুষের কাছে শীত মানে হয়তো আরাম, কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম, কিংবা গরম চায়ের কাপ। কিন্তু গ্রামগঞ্জের দরিদ্র মানুষ, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী কিংবা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের কাছে শীত মানে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে শীত মানেই এক ধরনের বৈপরীত্য। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে শীত মানে উৎসব, ভ্রমণ আর ফ্যাশনের উপলক্ষ্য। অথচ গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, ভাসমান জনগোষ্ঠী কিংবা খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষের কাছে শীত মানে কষ্ট, অসুস্থতা এবং কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর লড়াই। এবারের সাত দিনব্যাপী ঠান্ডা কনকন শৈত্যপ্রবাহ সেই বাস্তবতাকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খোলা মাঠ, চর এলাকা ও নদীঘেঁষা অঞ্চলে শীতের কামড় সবচেয়ে নির্মম হয়ে উঠতে পারে বলে ইতোমধ্যে ধারণা করা হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগে শীতের তীব্রতা বরাবরই বেশি। উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস আর কম আর্দ্রতা মিলিয়ে শীত এখানে যেন আরও ধারালো। অন্যদিকে খুলনা বিভাগে কুয়াশা ও আর্দ্রতার কারণে ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে তখন বাড়তি চাপ পড়ে, অথচ সেখানকার প্রস্তুতি অনেক সময়ই পর্যাপ্ত থাকে না।

রাজশাহী বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শীতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার ভূ-প্রকৃতি, কম আর্দ্রতা এবং উত্তর দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস শীতকে আরও কনকনে করে তোলে। অন্যদিকে খুলনা বিভাগে শীতের সঙ্গে যুক্ত হয় ঘন কুয়াশা ও আর্দ্রতার প্রভাব; যা স্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি এবং হৃদ্রোগজনিত জটিলতা বাড়ে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে; যা আমাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

আমাদের দেশে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শৈত্যপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কৃষিখাতে এর প্রভাব সরাসরি ও বহুমাত্রিক। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতেও। কৃষিখাতে বোরো ধানের বীজতলা, শাকসবজি ও অন্যান্য রবি ফসল শীতের তীব্রতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কুয়াশার কারণে সূর্যালোক কমে গেলে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দিনমজুরদের কাজের সুযোগ কমে যায়, ফলে বাড়ে দারিদ্র্যের চাপ।

কৃত্রিমভাবে মাছ চাষেও কনকনে শীতের প্রভাব পড়ে। পানির তাপমাত্রা কমে গেলে মাছের রোগবালাই বাড়ে। অর্থাৎ কনকন শুধু তাপমাত্রার বিষয় নয়। এটি জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এই শীত যেন একদিকে ঠান্ডা বাতাস, অন্যদিকে জীবিকার ওপর জমে ওঠা বরফ। এছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার দিকেও বেশী নজর দেবার সময় এসে গেছে।

এবারের শীতে আমাদের সবার প্রস্তুতি কতটা? প্রতি বছর শীত আসে, প্রতি বছরই আমরা কিছু কম্বল বিতরণ করি, কিছু সতর্কবার্তা দিই, তারপর শীত কেটে গেলে বিষয়টি ভুলে যাই। এই চক্রাকার প্রতিক্রিয়াশীলতা আমাদের নীতিনির্ধারণের একটি বড় দুর্বলতা।

শৈত্যপ্রবাহকে আমরা এখনো অনেকাংশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখি না। বরং মৌসুমি আরাম অথবা অস্বস্তি হিসেবেই দেখি। অথচ দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যত একটি নীরব দুর্যোগ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় এখানে অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং কমিউনিটি পর্যায়ের উদ্যোগগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কম্বল বিতরণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়।

শীতকালীন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, বিশেষ করে ভাসমান ও গৃহহীন মানুষের জন্য উষ্ণ আশ্রয়ের ব্যবস্থা আরো কার্যকর হতে পারে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় শীতজনিত রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনবল নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে পূর্বাভাসভিত্তিক প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া জরুরি। বিডব্লিউওটির মতো সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দিয়ে আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে। কোন এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ বেশি হবে, কতদিন স্থায়ী হতে পারে- এ তথ্যগুলো স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আবহাওয়া তথ্যকে কেবল সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তে রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কনকনে শৈত্যপ্রবাহ আমাদের জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন তাপপ্রবাহ ও বন্যা বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি শীতের ধরনও বদলাচ্ছে। কখনো স্বল্পস্থায়ী, কখনো দীর্ঘস্থায়ী আবার কখনো অস্বাভাবিক তীব্র শীত, এই অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে। তাই শীতকে আর আলাদা করে দেখা যাবে না; এটি জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শৈত্যপ্রবাহকে কেবল তাপমাত্রার হিসাব দিয়ে নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা দরকার। কোন অঞ্চলে কারা বেশি ঝুঁকিতে, কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, এই প্রশ্নগুলো সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে গুজব বা অতিরঞ্জন না করে দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশন জরুরি, যাতে মানুষ সচেতন হয় কিন্তু আতঙ্কিত না হয়।

এই কনকনে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর। ভোরের কুয়াশায় পোস্টার লাগানো, রাতের ঠান্ডায় পাহারা দেওয়া কিংবা দূর-দূরান্তে হেঁটে প্রচারণা চালানো সবই হয়ে উঠছে কঠিন। অনেক স্বেচ্ছাসেবী কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ কেউ কাজই কমিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বড় দলগুলোর সংগঠিত শক্তি কিছুটা সুবিধা পেলেও, ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পড়ছেন বাড়তি চাপে।

শীত আবার নির্বাচনি বার্তাকেও ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভোটারদের কাছে এখন উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি তাৎক্ষণিক বাস্তবতা বড় হয়ে উঠছে কম্বল, শীতবস্ত্র, চিকিৎসা, সহানুভূতি। কোথাও কোথাও শীতবস্ত্র বিতরণই হয়ে উঠছে প্রচারণার অংশ। এতে মানবিক সহায়তা আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। শৈত্যপ্রবাহ কনকন যেন নির্বাচনি মাঠে নৈতিকতার আলোচনাকেও উসকে দিচ্ছে।

এবারের কনকনে শৈত্যপ্রবাহ আমাদের আরো মনে করিয়ে দিচ্ছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস শুধু জানার বিষয় নয়, এখনই এর বিরুদ্ধে যথাযথ প্রস্তুতির বিষয়। স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ ছাড়া এই কনকনে শীতের ভয় কাটানো সম্ভব নয়। নামেই যখন কাঁপুনি, বাস্তবে যেন তা আর পোড়ের আগুন হয়ে না ওঠে, সেটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

এ বছরের প্রথম শৈত্যপ্রবাহ কনকন আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা। তবে কনকনে ঠান্ডা মোকাবেলার সাথে এই পরীক্ষা শুধু আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতা, নীতিগত দূরদর্শিতা ও সমন্বিত প্রস্তুতিরও পরীক্ষা।

শীত কেটে গেলে আমরা যদি আবার সব ভুলে যাই, তাহলে পরের ‘কনকন’ আরো নির্মম হয়ে ফিরবে। কিন্তু যদি এবার আমরা শীতকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি, আগাম প্রস্তুতি নিই এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই, তাহলে এই কনকনে শীতও আমাদের জন্য একটি শেখার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: প্রফেসর, সমাজকর্ম বিভাগ ও সাবেক ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/ কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

শৈত্যপ্রবাহ ‘কনকন’: নামেই যেন কাঁপুনি

আপডেট সময় : ০৮:৪২:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

এবারের শীত মৌসুমে প্রথম শৈত্যপ্রবাহ আসছে ‘কনকন’ নাম ধারণ করে। বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের (বিডব্লিউওটি)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ‘এই শৈত্যপ্রবাহ কয়েক দিন ধরে দেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে।’

শীত বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু যে নামটা উচ্চারণ করলেই গায়ে কাঁটা দেয় তা হচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। আর সেটার নাম যদি কনকন হয়তো আর কোনো কথাই নেই! কারণ এই নামের মধ্যেই যেন শীতের কাঁপুনি আর আগুন জ্বালানোর তাড়না লুকিয়ে আছে। কনকন-এর মতো শৈত্যপ্রবাহ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, শীত বাংলাদেশের এমন একটি ঋতু; যা ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে নানা বৈপরীত্য জানান দিতে আসে আর সেটাই অনেকের জন্য এটি এক কঠিন বাস্তবতা।

শহরের মানুষের কাছে শীত মানে হয়তো আরাম, কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম, কিংবা গরম চায়ের কাপ। কিন্তু গ্রামগঞ্জের দরিদ্র মানুষ, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী কিংবা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের কাছে শীত মানে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে শীত মানেই এক ধরনের বৈপরীত্য। শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে শীত মানে উৎসব, ভ্রমণ আর ফ্যাশনের উপলক্ষ্য। অথচ গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, ভাসমান জনগোষ্ঠী কিংবা খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষের কাছে শীত মানে কষ্ট, অসুস্থতা এবং কখনো কখনো জীবন-মৃত্যুর লড়াই। এবারের সাত দিনব্যাপী ঠান্ডা কনকন শৈত্যপ্রবাহ সেই বাস্তবতাকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খোলা মাঠ, চর এলাকা ও নদীঘেঁষা অঞ্চলে শীতের কামড় সবচেয়ে নির্মম হয়ে উঠতে পারে বলে ইতোমধ্যে ধারণা করা হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগে শীতের তীব্রতা বরাবরই বেশি। উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস আর কম আর্দ্রতা মিলিয়ে শীত এখানে যেন আরও ধারালো। অন্যদিকে খুলনা বিভাগে কুয়াশা ও আর্দ্রতার কারণে ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে তখন বাড়তি চাপ পড়ে, অথচ সেখানকার প্রস্তুতি অনেক সময়ই পর্যাপ্ত থাকে না।

রাজশাহী বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শীতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার ভূ-প্রকৃতি, কম আর্দ্রতা এবং উত্তর দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস শীতকে আরও কনকনে করে তোলে। অন্যদিকে খুলনা বিভাগে শীতের সঙ্গে যুক্ত হয় ঘন কুয়াশা ও আর্দ্রতার প্রভাব; যা স্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি এবং হৃদ্রোগজনিত জটিলতা বাড়ে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে; যা আমাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

আমাদের দেশে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শৈত্যপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কৃষিখাতে এর প্রভাব সরাসরি ও বহুমাত্রিক। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতেও। কৃষিখাতে বোরো ধানের বীজতলা, শাকসবজি ও অন্যান্য রবি ফসল শীতের তীব্রতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কুয়াশার কারণে সূর্যালোক কমে গেলে ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দিনমজুরদের কাজের সুযোগ কমে যায়, ফলে বাড়ে দারিদ্র্যের চাপ।

কৃত্রিমভাবে মাছ চাষেও কনকনে শীতের প্রভাব পড়ে। পানির তাপমাত্রা কমে গেলে মাছের রোগবালাই বাড়ে। অর্থাৎ কনকন শুধু তাপমাত্রার বিষয় নয়। এটি জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এই শীত যেন একদিকে ঠান্ডা বাতাস, অন্যদিকে জীবিকার ওপর জমে ওঠা বরফ। এছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার দিকেও বেশী নজর দেবার সময় এসে গেছে।

এবারের শীতে আমাদের সবার প্রস্তুতি কতটা? প্রতি বছর শীত আসে, প্রতি বছরই আমরা কিছু কম্বল বিতরণ করি, কিছু সতর্কবার্তা দিই, তারপর শীত কেটে গেলে বিষয়টি ভুলে যাই। এই চক্রাকার প্রতিক্রিয়াশীলতা আমাদের নীতিনির্ধারণের একটি বড় দুর্বলতা।

শৈত্যপ্রবাহকে আমরা এখনো অনেকাংশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখি না। বরং মৌসুমি আরাম অথবা অস্বস্তি হিসেবেই দেখি। অথচ দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যত একটি নীরব দুর্যোগ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় এখানে অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং কমিউনিটি পর্যায়ের উদ্যোগগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কম্বল বিতরণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়।

শীতকালীন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, বিশেষ করে ভাসমান ও গৃহহীন মানুষের জন্য উষ্ণ আশ্রয়ের ব্যবস্থা আরো কার্যকর হতে পারে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় শীতজনিত রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনবল নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে পূর্বাভাসভিত্তিক প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া জরুরি। বিডব্লিউওটির মতো সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দিয়ে আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে। কোন এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ বেশি হবে, কতদিন স্থায়ী হতে পারে- এ তথ্যগুলো স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আবহাওয়া তথ্যকে কেবল সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তে রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কনকনে শৈত্যপ্রবাহ আমাদের জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন তাপপ্রবাহ ও বন্যা বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি শীতের ধরনও বদলাচ্ছে। কখনো স্বল্পস্থায়ী, কখনো দীর্ঘস্থায়ী আবার কখনো অস্বাভাবিক তীব্র শীত, এই অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে। তাই শীতকে আর আলাদা করে দেখা যাবে না; এটি জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শৈত্যপ্রবাহকে কেবল তাপমাত্রার হিসাব দিয়ে নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা দরকার। কোন অঞ্চলে কারা বেশি ঝুঁকিতে, কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, এই প্রশ্নগুলো সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে গুজব বা অতিরঞ্জন না করে দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশন জরুরি, যাতে মানুষ সচেতন হয় কিন্তু আতঙ্কিত না হয়।

এই কনকনে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর। ভোরের কুয়াশায় পোস্টার লাগানো, রাতের ঠান্ডায় পাহারা দেওয়া কিংবা দূর-দূরান্তে হেঁটে প্রচারণা চালানো সবই হয়ে উঠছে কঠিন। অনেক স্বেচ্ছাসেবী কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ কেউ কাজই কমিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বড় দলগুলোর সংগঠিত শক্তি কিছুটা সুবিধা পেলেও, ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পড়ছেন বাড়তি চাপে।

শীত আবার নির্বাচনি বার্তাকেও ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভোটারদের কাছে এখন উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি তাৎক্ষণিক বাস্তবতা বড় হয়ে উঠছে কম্বল, শীতবস্ত্র, চিকিৎসা, সহানুভূতি। কোথাও কোথাও শীতবস্ত্র বিতরণই হয়ে উঠছে প্রচারণার অংশ। এতে মানবিক সহায়তা আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। শৈত্যপ্রবাহ কনকন যেন নির্বাচনি মাঠে নৈতিকতার আলোচনাকেও উসকে দিচ্ছে।

এবারের কনকনে শৈত্যপ্রবাহ আমাদের আরো মনে করিয়ে দিচ্ছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস শুধু জানার বিষয় নয়, এখনই এর বিরুদ্ধে যথাযথ প্রস্তুতির বিষয়। স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ ছাড়া এই কনকনে শীতের ভয় কাটানো সম্ভব নয়। নামেই যখন কাঁপুনি, বাস্তবে যেন তা আর পোড়ের আগুন হয়ে না ওঠে, সেটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

এ বছরের প্রথম শৈত্যপ্রবাহ কনকন আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা। তবে কনকনে ঠান্ডা মোকাবেলার সাথে এই পরীক্ষা শুধু আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতা, নীতিগত দূরদর্শিতা ও সমন্বিত প্রস্তুতিরও পরীক্ষা।

শীত কেটে গেলে আমরা যদি আবার সব ভুলে যাই, তাহলে পরের ‘কনকন’ আরো নির্মম হয়ে ফিরবে। কিন্তু যদি এবার আমরা শীতকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি, আগাম প্রস্তুতি নিই এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই, তাহলে এই কনকনে শীতও আমাদের জন্য একটি শেখার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: প্রফেসর, সমাজকর্ম বিভাগ ও সাবেক ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/ কেএমএএ