এ দেশে বহু শিশু বয়সের তুলনায় ভারী বোঝা বইছে। কেউ চায়ের দোকানে কাজ করছে, কেউ রিকশার গ্যারেজে কেউ বা নির্মাণস্থলে শ্রমিক হিসেবে দিন কাটাচ্ছে। এই কোমলমতি শিশুদের জন্য যেখানে থাকা উচিত ছিল বইয়ের জগৎ, খেলার মাঠ আর নির্মল শৈশব; সেখানে তারা দিন পার করছে অভাবের তাড়নায় এবং বড়দের অবহেলায়। এই বৈষম্য দূর করতে হলে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। দেশে বর্তমানে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমে নিযুক্ত আছে। তাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই রয়েছে ১০ লাখের বেশি শিশু। এ রকম একটি তথ্য হাজির করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই সরকার শিশুশ্রম দূর করতে চায়। আমাদের দেশের অনেক শিশুই তাদের শৈশব উদ্যাপন করতে পারে না। একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন হয়, তা থেকে অনেক শিশুই থাকে বঞ্চিত।
বলার অপেক্ষা রাখে না, শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নিলেও তা কমার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। মূলত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণেই শিশুরা স্কুলে না গিয়ে কাজে জড়িয়ে পড়ে। দারিদ্র্যই এর মূল কারণ। কিন্তু বহুল জনসংখ্যার এই দেশে দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর কোনো আলামত এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের শিশুদের জন্য সুশৃঙ্খল কোনো ব্যবস্থা নেই; যা তাকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকতে বাধ্য করবে। পরিবারের অভাব, বেকার বা স্বল্প আয়ের অভিভাবক, শিশুদের কাজে যুক্ত হতে বাধ্য করে। শিশুর পরিশ্রমের বিনিময়ে যে অর্থ উপার্জন করা হয়, তা পরিবারের অনেক আর্থিক সংকট নিরসনের কাজে ব্যয় হয়। ফলে পরিবারের পক্ষ থেকেও শিশুশ্রমকে খারাপ চোখে দেখা হয় না। বড় বড় সভা-সেমিনারে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বহু কথা বলা হয়েছে। শিশুশ্রম নিবারণের জন্য অনেক ধরনের তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে। কিন্তু অসচ্ছল অভিভাবকদের কান পর্যন্ত তা পৌঁছায়নি।
বলা বাহুল্য, পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণেই শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। ভাত-কাপড়ের সংগ্রাম সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। শিশুদের শিক্ষালয়ে বিনামূল্যে বই দেওয়ার পাশাপাশি তাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে হয়তো অনেক শিশুই স্কুলে যেতে পারত। কারিগরি শিক্ষার দিগন্ত আরো বিকশিত করে তোলা হলে ঝুঁকিহীন কাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারত শিশুরা। দেখা গেছে, বিভিন্ন মালিকপক্ষ অল্প বেতনে শিশুদের কাজে নিতে দ্বিধা করেন না। এর মধ্যে ইটভাটা, গার্মেন্টস, ওয়ার্কশপ, রেস্তোরাঁ ও গৃহকর্মে শিশুরা কাজ করে থাকে। যারা জেনে-শুনে শিশুদের নিয়োগ করে, তাদের অর্থদণ্ড বা আরো কঠোর হয়ে লাইসেন্স বাতিল করা হলে হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে তাদের ব্যবহার বন্ধ করা যেত। অবশ্য এককভাবে সরকারের পক্ষে শিশুশ্রম থেকে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব নয়। এ জন্য এলাকাভিত্তিক সচেতনতার খুব প্রয়োজন। এলাকার শিশুরা পড়াশোনা করছে, নাকি চলে যাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে- তা স্থানীয়দের পক্ষেই জানা সম্ভব। এলাকার শিশুদের জীবন যেন কলুষিত না হয়, তা দেখার দায়িত্ব রয়েছে সামাজিক সংগঠনগুলোর। মসজিদ, মন্দির, চার্চ, স্কুল ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা যদি অভিভাবকদের শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতে পারেন, তাহলে শিশুরা কোমল একটি শৈশব পেতে পারে। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, শিক্ষা, আইনের শাসন ও সামাজিক দায়িত্ব সমন্বিত করা ছাড়া শিশুশ্রম থেকে মুক্তি নেই। দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা, প্রাথমিক শিক্ষায় সব শিশুর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে মুক্তি সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক শিশু একেকটি সম্ভাবনার নাম। তাদের হাতে কাজের ভার নয়, তুলে দিতে হবে স্বপ্ন গড়ার সরঞ্জাম। তাই আমাদের প্রত্যাশা, শিশুশ্রম বন্ধে রাষ্ট্রসহ সমাজের বিবেকবোধ দ্রুত জাগ্রত হবে।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ























