নিজস্ব প্রতিবেদক : কক্সবাজারের চকরিয়ার সড়কে যে দুর্ঘটনায় পাঁচ ভাই নিহত হয়েছে, তার জন্য কুয়াশার মধ্যে পিকআপভ্যানটির লাইসেন্সহীন চালকের বেপরোয়া গতিকে দায়ী করেছে র্যাব।
ওই গাড়িটির চালক সহিদুল ইসলাম সাইফুলকে (২২) গ্রেপ্তারের পর গতকাল শনিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের এই বক্তব্য আসে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকায় পিকআপের চাপায় মারা যান পাঁচ ভাই অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫), চম্পক সুশীল (৩০) ও স্মরণ সুশীল (২৪)। আহত হন আরেক ভাই রক্তিম সুশীল এবং বোন হীরা সুশীল।
তারা নয় ভাই-বোন তাদের বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অংশ হিসেবে পূজা শেষ করে রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তখনই পিকআপভ্যানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের চাপা দেয়। তার তিন দিন পর শুক্রবার মধ্যরাতে র্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১৫ ঢাকার মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে সাইফুলকে গ্রেপ্তার করে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, চকরিয়া থেকে কক্সবাজারে সবজিবোঝাই পিকআপ নিয়ে যাচ্ছিলেন সাইফুল। রাস্তায় প্রচুর কুয়াশা থাকা সত্ত্বেও তিনি সবজি দ্রুত পৌঁছে দিতে বেপরোয়া গতিতে চালাচ্ছিলেন।
“অধিক কুয়াশা ও অতিরিক্ত গতির কারণে মালুমঘাট বাজারের নার্সারি গেটের সামনে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষারতদেরকে চালক সাইফুল দূর থেকে লক্ষ্য করতে পারেনি। গাড়ির গতি বেশি থাকার কারণে কাছাকাছি এসে লক্ষ্য করলেও গাড়িটি সে নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে দুর্ঘটনাটি ঘটায়।”
গাড়িটি ৬৫-৭০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল জানিয়ে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, “চালক গাড়ি থামানোর জন্য ব্রেক করলেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি প্রায় ১০০ ফুটের মতো সামনে চলে যায়।”
দুর্ঘটনার সময় পিকআপভ্যান মালিক মাহমুদুল করিমের ছেলে তারেক ও ভাগ্নে রবিউল গাড়িতে ছিল বলে র্যাবকে জানিয়েছেন সাইফুল।
“পরবর্তীতে চালক পিকআপ থেকে নেমে নিহতদের দেখতে আসলেও মালিকের ছেলে তারেকের নির্দেশে সে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়,” বলেন আল মঈন।
তিনি বলেন, মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী সাইফুল ডুলাহাজরায় গিয়ে পিকআপ ভ্যানটি রেখে বাসে করে চকরিয়া গিয়ে মালিকের সঙ্গে দেখা করেন। মাহমুদুল তাকে কমপক্ষে এক বছর আত্মগোপনে থাকার পরামর্শ দিলে তিনি প্রথমে বান্দরবানের লামার রাবার বাগানে আত্মগোপন করেন। পরে ঢাকায় চলে আসেন।
সাইফুলের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই জানিয়ে আল মঈন বলেন, অথচ গত দুই বছর ধরে তিনি পিকআপভ্যান, চান্দের গাড়ি ও তিন টন ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চালিয়ে আসছিলেন। এই দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ আগে তিনি পিকআপভ্যানটি মালিকের কাছ থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির বিনিময়ে চালানো শুরু করেন।
পিকআপভ্যানটির মালিক মাহমুদুল করিম সবজি পরিবহনের ব্যবসা করেন। তিনি চকরিয়ার সবজির আড়ৎ থেকে কক্সবাজার সদর ও মহেশখালী এলাকায় সবজি সরবরাহ করতেন। তার ছেলে তারেক সবজি সরবরাহের তদারক করেন, ভাগ্নে রবিউল তারেকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।
র্যাব জানিয়েছে, মাহমুদুল ২০১৬ সালে এই পিকআপ ভ্যানটি কেনেন। গত চার বছর ধরে গাড়িটির ফিটনেস এবং তিন বছর দরে রুট পারমিট মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। ঘটনার পর থেকে মাহমুদুল, তার ছেলে তারেক ও ভাগ্নে রবিউল পালিয়ে আছেন বলে জানায় র্যাব। এ ঘটনায় নিহতদের ভাই প্লাবন সুশীল (২২) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পিকআপচালককে আসামি করে চকরিয়া থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন। আল মঈন বলেন, “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার পিকআপের চালক সাইফুল নিহতদেরকে গাড়ি চাপা দেওয়ার সাথে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বীকার করে। তার কাছ থেকে পিকআপের চাবিটিও উদ্ধার করেছে র্যাব। নিহতের পরিবারের সাথে সাইফুলের কোনো পূর্বপরিচিতি ছিল না বলে সে আমাদের জানিয়েছে।”
লাইসেন্সহীন চালকের বেপরোয়া গতিতে চকরিয়ার দুর্ঘটনা
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ