ঢাকা ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
সম্পাদকীয়----------------

রাষ্ট্র সংস্কার কতটুকু কী হলো এবং সুফল কবে?

  • আপডেট সময় : ০৯:৪৩:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন আশায় বুক বেঁধেছিল দেশের মানুষ। এটাও বলা যায়, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনে অতীষ্ঠ হয়েই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিল আমজনতা। এই জনতার আশা ছিল দীর্ঘ স্বৈরশাসন পরবর্তী একটি গুণমানসম্পন্ন দেশ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। আর সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার। দেড় বছর মেয়াদী এই সরকারের আমল প্রায় শেষ। কিন্তু সরকার জনপ্রত্যাশা কতটুকু কী পূরণ করতে পারলো- এ প্রশ্ন কেবল বিরোধী কিংবা সমালোচকদের মুখেই নয়, খোদ সরকার-সংশ্লিষ্টদের মধ্য থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে উঠছে।

অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন খাত উন্নয়নে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। যাতে সরকার সবচেয়ে বেশি সময়-শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছে। জনপ্রত্যাশার মূলেও ছিল সংস্কার। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ ৫৪ বছরেও যে সুশাসন বাংলাদেশ পায়নি, এবারের সংস্কারের মধ্য দিয়ে বস্তুত সেটাই আশা করেছিল জাতি। কিন্তু বাস্তবে সংস্কারের কতটুকু কী হয়েছে এবং এর সুফল কবে কতখানি পাওয়া যাবে-এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

গত ১২ জানুয়ারি সোমবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে একটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে যার মূল শিরোনামগুলোর মধ্যে ছিল -রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে তৈরি হচ্ছে দায়মুক্তির ফাঁদ; অধ্যাদেশগুলোতে জুলাই সনদের চেতনা উপেক্ষিত; উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের একাংশ বেশি প্রভাবশালী; সাইবার অধ্যাদেশের অপব্যবহারের আশঙ্কা; ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ নিয়েও উদ্বেগ; ‘অপরাধ প্রতিরোধ’-এর নামে ঢালাও নজরদারি ইত্যাদি।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক অধ্যাদেশগুলোতে তার স্পষ্ট প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করে রেকর্ড গড়া হলেও এসব আইনি কাঠামোর বড় অংশে জুলাই সনদের চেতনা উপেক্ষিত। বরং সংস্কারের নামে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও নিজস্ব বিবেচনায় একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মৌলিক সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংস্কারের নামে এমন আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং পুরোনো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালনের অংশ হিসেবে টিআইবি ধারাবাহিকভাবে আইনের খসড়া পর্যালোচনা ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিয়ে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হওয়ায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানালেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাতে যৌক্তিক প্রস্তাব উপেক্ষিত থাকার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পর্যবেক্ষণ উপস্থাপনায় আরো বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছে, তার মধ্যে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধক মহল, বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকার নতিস্বীকার করেছে। ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

উল্লেখ্য, অন্তবর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনগুলোর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। স্পষ্টত উপলব্ধি করা যায় যে, সংস্কারের নামে যা হয়েছে, কার্যত তার কোনো সুফল জাতি পাবে না। কিন্তু দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে গেলে সংস্কারের বিকল্প কোনো উপায় নেই।

অতএব, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা সরকার গঠন করবে, অবহেলিত কিংবা অবশিষ্ট সংস্কার কার্যক্রমের দায়িত্ব তাদের। সংস্কারকে নতুন ও কার্যকর মাত্রায় এগিয়ে নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণ করা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ।

সানা/আপ্র/১৩/০১/২০২৬

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

সম্পাদকীয়----------------

রাষ্ট্র সংস্কার কতটুকু কী হলো এবং সুফল কবে?

আপডেট সময় : ০৯:৪৩:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন আশায় বুক বেঁধেছিল দেশের মানুষ। এটাও বলা যায়, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনে অতীষ্ঠ হয়েই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তুলেছিল আমজনতা। এই জনতার আশা ছিল দীর্ঘ স্বৈরশাসন পরবর্তী একটি গুণমানসম্পন্ন দেশ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। আর সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার। দেড় বছর মেয়াদী এই সরকারের আমল প্রায় শেষ। কিন্তু সরকার জনপ্রত্যাশা কতটুকু কী পূরণ করতে পারলো- এ প্রশ্ন কেবল বিরোধী কিংবা সমালোচকদের মুখেই নয়, খোদ সরকার-সংশ্লিষ্টদের মধ্য থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে উঠছে।

অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন খাত উন্নয়নে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। যাতে সরকার সবচেয়ে বেশি সময়-শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছে। জনপ্রত্যাশার মূলেও ছিল সংস্কার। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ ৫৪ বছরেও যে সুশাসন বাংলাদেশ পায়নি, এবারের সংস্কারের মধ্য দিয়ে বস্তুত সেটাই আশা করেছিল জাতি। কিন্তু বাস্তবে সংস্কারের কতটুকু কী হয়েছে এবং এর সুফল কবে কতখানি পাওয়া যাবে-এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

গত ১২ জানুয়ারি সোমবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে একটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে যার মূল শিরোনামগুলোর মধ্যে ছিল -রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে তৈরি হচ্ছে দায়মুক্তির ফাঁদ; অধ্যাদেশগুলোতে জুলাই সনদের চেতনা উপেক্ষিত; উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ে আমলাতন্ত্রের একাংশ বেশি প্রভাবশালী; সাইবার অধ্যাদেশের অপব্যবহারের আশঙ্কা; ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ নিয়েও উদ্বেগ; ‘অপরাধ প্রতিরোধ’-এর নামে ঢালাও নজরদারি ইত্যাদি।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক অধ্যাদেশগুলোতে তার স্পষ্ট প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করে রেকর্ড গড়া হলেও এসব আইনি কাঠামোর বড় অংশে জুলাই সনদের চেতনা উপেক্ষিত। বরং সংস্কারের নামে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও নিজস্ব বিবেচনায় একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মৌলিক সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংস্কারের নামে এমন আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং পুরোনো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালনের অংশ হিসেবে টিআইবি ধারাবাহিকভাবে আইনের খসড়া পর্যালোচনা ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিয়ে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হওয়ায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানালেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাতে যৌক্তিক প্রস্তাব উপেক্ষিত থাকার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পর্যবেক্ষণ উপস্থাপনায় আরো বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছে, তার মধ্যে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধক মহল, বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকার নতিস্বীকার করেছে। ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

উল্লেখ্য, অন্তবর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনগুলোর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। স্পষ্টত উপলব্ধি করা যায় যে, সংস্কারের নামে যা হয়েছে, কার্যত তার কোনো সুফল জাতি পাবে না। কিন্তু দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে গেলে সংস্কারের বিকল্প কোনো উপায় নেই।

অতএব, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা সরকার গঠন করবে, অবহেলিত কিংবা অবশিষ্ট সংস্কার কার্যক্রমের দায়িত্ব তাদের। সংস্কারকে নতুন ও কার্যকর মাত্রায় এগিয়ে নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণ করা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ।

সানা/আপ্র/১৩/০১/২০২৬