নুসরৎ নওরিন : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন দুটি শব্দ বেশ আলোচিত হচ্ছে। কিছুদিন আগে অভিনেত্রী পরীমনির গ্রেপ্তারের পর চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে একজন জ্যেষ্ঠ অভিনেত্রী মন্তব্য করেন, ‘সন্ধ্যার পর একটা মেয়ের একা ঘর থেকে বের হওয়াই বিপজ্জনক।’ এর কিছুদিন আগে কথিত মডেল মৌ ও পিয়াসা গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় মৌ ও পিয়াসা ‘রাতের রানি’ হিসেবে পরিচিত।
পরীমনির গ্রেপ্তারের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছিল। মাত্র দুই মাস আগে ঢাকার এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তিনি ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ করেন। কোনো শক্তিশালী মহলকে বাঁচাতে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ আরও বহু বিষয় থেকে দৃষ্টি সরানোর উদ্দেশ্যেই একজন নারীকে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সে আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান। ‘ফেসবুকের আদালতে’ পরীমনি কিংবা মৌ-পিয়াসার রায় হয়ে গেছে, হচ্ছে। তাঁদের কী করা উচিত এবং উচিত নয় সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে মেয়ে নেটওয়ার্ক নামে একটি যুব সংগঠনের পেজ থেকে ‘রাতের রানী’ নামে প্রোফাইল ছবির ফ্রেম তৈরি করা হয়। তাদের পেজে ফ্রেমটি সম্পর্কে বলা হয়, ‘মেয়েরা ঘর থেকে বের হবে। দিনে–রাতে যখন খুশি বাইরে যাবে। সন্ধ্যার পর বাইরে গেলে যদি মেয়েদের রাতের রানি ডেকে কটাক্ষ করা যায়, তবে আমরা সবাই রাতের রানি।’ অনেকেই পরীমনি, মৌ, পিয়াসাদের নিয়ে মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে এই ফ্রেম ব্যবহার করছেন।
‘রাতের রানি’ শব্দ দুটো ব্যবহার করে তাঁরা শব্দটিকে নির্বিষ করতে চান। নেতিবাচক যে অর্থে এ ধরনের শব্দ যুগ যুগ ধরে নারীকে হেয় করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, গণহারে নিজেদের ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করে নারীর বিরুদ্ধে একটি হাতিয়ার হিসেবে শব্দ দুটিকে অসার করে তোলাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
উদ্দেশ্য অভিনেত্রী পরীমনির জন্য সুবিচার এবং তাঁর প্রতি সহমর্মিতা। তাঁদের যুক্তি, শব্দ দুটি আর দশটা তাৎপর্যহীন সাধারণ শব্দের কাতারে দাঁড়ালে ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ দিয়ে নারীকে ঘায়েল করার চেষ্টা ব্যর্থ হবে।
পরীমনির প্রতি সহমর্মী হলেও প্রতিবাদের এ ধরনকে অনেকেই সমর্থন করছেন না। তাঁদের যুক্তি, যাঁদের প্রতি সহমর্মী হয়ে এ প্রচারণা শুরু, তাঁরা কি শব্দ দুটি নিজেদের ক্ষেত্রে ব্যবহারে স্বস্তি পেতেন? এটাকে গর্বের সঙ্গে নিতেন? নাকি বিষয়টি এটাই প্রতিষ্ঠিত করে যে তারা ‘রাতের রানি’। এতে কি তাঁরা আরও হেয় হচ্ছেন না?
ঠিক এ জায়গাতেই আপত্তি প্রথমোক্ত দলের। তাঁরা বলছেন, যাঁরা শব্দ দুটিতে দ্বিধায় ভ্রু কুঁচকে ফেলছেন, তাঁদের পিতৃতান্ত্রিক চেতনায় ঘা লাগায় আপত্তি করছেন। এ আপত্তির জায়গাটা বদলানোই হচ্ছে কাজ। তাঁদের উদ্দেশ্য শব্দটি বিশেষ কোনো গাত্রদাহ, সম্মান-অসম্মানের বিষয় যেন আর না থাকে। বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে মৌখিক সহিংসতায় এসব শব্দ কোনো হাতিয়ার না হয়।
পক্ষ-বিপক্ষের এ আলোচনার বাইরে কেউ কেউ মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ ধরনের আন্দোলন জনবিচ্ছিন্ন ও গুটিকয়ের প্রতিবাদ। এরপরও যাঁরা এর সঙ্গে একাত্মতা জানাতে চান, তাঁরা সামিল হচ্ছেন। নারীদের পাশাপাশি পুরুষেরাও এই ‘রাতের রানি’ ফ্রেম দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করছেন।
সমাজে নারীকে হেয় করা শব্দের ব্যবহার নিয়ে বেসরকারি সংস্থা একশনএইড ২০১৯ সালে বাংলাদেশে একটি গবেষণা করে। এ গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা ভাষায় অধিকাংশ হয়রানিমূলক গালি, তিরস্কারের শব্দ ব্যবহার হয় নারীকে অবমাননার জন্য। বেশির ভাগ প্রচলিত গালি স্ত্রী লিঙ্গের এবং এমন অনেক শব্দের কোনো পুরুষবাচক নেই। যেমন ‘বেশ্যা’। শরীরই নারীর চরিত্রের একমাত্র মানদ- এবং সঠিক-বেঠিক, নৈতিক-অনৈতিকের ক্ষেত্রে আর কোনো মানদ- নেই। পুরুষের ক্ষেত্রে বরং শরীর কোনো মানদ-ই নয় এবং তার জন্য গালির শব্দগুলো তুলনামূলক কম অবমাননাজনক।
সারা পৃথিবীতেই শব্দের রাজনীতির বিষয়ে মানুষ ক্রমে সচেতন হয়ে উঠছে। ২০১১ সালে কানাডার টরন্টোতে এক পুলিশ কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, নারীদের ধর্ষণ থেকে বাঁচতে ‘স্লাট’ বা ‘বেশ্যা’র মতো পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিবিসির সংবাদমতে, শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় নারীদের তিরস্কার করতে ‘স্লাট’ শব্দটি আটলান্টিক তীরবর্তী দেশগুলোতে প্রচুর ব্যবহৃত হয়।
পুলিশ কর্মকর্তার ওই মন্তব্যের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কয়েক হাজার নারী বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে প্রতিবাদী বক্তব্য ফুটে ওঠে। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, গর্বিত ‘স্লাট’, আরেকটিতে, ‘কীভাবে পোশাক পরতে হবে আমাকে তা বোলো না, পুরুষদের বলো ধর্ষণ না করতে।’ এ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী অনেক নারী আন্দোলনটির নাম দিয়েছিলেন, ‘স্লাটওয়াকস’। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ‘স্লাট’ শব্দটিকে অধপতিত অবস্থা থেকে উদ্ধার করা।
মারিয়া বিয়াট্রিস জিওভানার্ডি নামের একজন ইতালীয় নারী ২০১৯ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের কাছে একটি আবেদন জানান। তিনি অক্সফোর্ড অভিধানে নারী শব্দের সমার্থক শব্দগুলোর তালিকা থেকে নারীর জন্য প্রচ- অবমাননাকর শব্দগুলো সরাতে বলেন। মারিয়া দেখেন, পুরুষ শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে অভিধানে মামুলি কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরের বছর অক্সফোর্ড তাদের অভিধান থেকে অপমানজনক শব্দগুলো বাদ দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসা এ আলোচনা এবং তর্কবিতর্ক হয়তো চলতে থাকবে। আমাদের গণমানসের আরও কিছু বিষয় এসব আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনেই স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে। ‘রাতের রানি’ প্রচলিত দ্যোতনা থেকে কতটুকু বের হতে পারবে এবং তা কত দিনে, সেই উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের ক্ষমতার রাজনীতিতে আমরা কতটুকু খেলতে পারি, সেটাও দেখার বিষয়।