ভুল একটি বাংলা শব্দ- যার সমার্থক শব্দ অনেক। যেমন- ভ্রান্তি, ভ্রম, প্রমাদ, ত্রুটি, গলদ, দোষ। এ শব্দগুলোর সঙ্গে সবাই কমবেশি পরিচিত। সবাই প্রতিদিন সহ্য ও অসহ্যের ভেতরে ভুলের সঙ্গে কথা বলে চলে। অতঃপর ভুলকে অনিয়ন্ত্রণ রেখে হারিয়ে ফেলে জীবনের প্রাপ্যতা। ভুল মানুষের শরীর ও মনের একটা অংশ। ভুলের বিচার নিজের জ্ঞানের উপরে থাকে- কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না। আবার কিছু ভুল শিক্ষা দেয়, জ্ঞান দিয়ে যায়, শক্তিশালী জ্ঞান দিয়ে থাকে। মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভুলের মোহ চলে আসছে। এ বিষয় নিয়েই এবারের সাহিত্য পাতার প্রধান রচনা
মানুষের সঙ্গে সর্বছায়া হয়ে আছে ভুল। পৃথিবী সৃষ্টির পর আল্লাহ্ অনেক সখ করে ফেরেস্তাদের নির্দেশ দেন। আদম (আ.) কে সৃষ্টির মাঝে মানব সৃষ্টির নিদর্শন এবং আল্লাহর কাছে প্রদর্শন করার জন্য। অতঃপর ফেরেস্তাদের নির্দেশ দিলেন মাটি সংগ্রহ করে মাটির তৈরি একটা সুন্দর গঠন আকার তৈরি করতে- সেই আকারের সুস্পষ্ট ধারণাও দিলেন। আদমের কায়া যখন তৈরি হলো সব ফেরেস্তার সামনে রাখার পর আল্লাহ্ রুহ প্রতিস্থাপন করলেন এবং আশরাফুল মাখলুকাত এর পূর্ণ করে দিলেন। আরশি আজম ওইদিন খুশিতে আত্মহারা। আল্লাহ্ স্বয়ং নিজে ফেরেস্তাদের নির্দেশ দেন, আদমকে সিজদার কথা বললেন। সবাই সিজদা করলেন, কিন্তু ইবলিশ ভুল করল- সেজদা দিল না। সেই ভুলে এখনো পৃথিবী ভুলের এবং অহংকারের ছায়ায় ঘেরা। মানুষ সৃষ্টির প্রথমাংশে ভুল করল ইবলিশ শয়তান। আল্লাহ্ আদমকে বেহেস্তে রাখলেন। অতঃপর বেহেশতে একাকীত্ব উপভোগ করতে লাগলেন নবী আদম (আ.)। তারপর তার সঙ্গী হিসেবে মা হাওয়াকে পাঠালেন, সেখানেও শয়তানের প্ররোচনায় গন্দম ফল খেলেন এবং আল্লাহর নিষেধ অমান্য করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বেহেস্ত থেকে বিতারিত হলেন। সেই ভুলের শাস্তি হিসেবে এখন এই পৃথিবীতে আমরা ভালো এবং মন্দ মানুষ বসবাস করি।
আমরা অনেকেই শরৎচন্দ্রের দেবদাস উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত। বিরল প্রেমের কাহিনি সারা দুনিয়া এখনো এই প্রেমের পাঠ করে। ব্যর্থ প্রেমের করুণ ইতিহাসে সারা দুনিয়া তখন কেঁদেছিল। হাতিপুতা গ্রামের জমিদার ছিল ভুবনমোহন চৌধুরী, সেখানে পার্বতীর বিয়ে হয়ে যায়। একপর্যায়ে প্রেমের কষ্টে শেষবারের মতো দেখা করার জন্যে পান্ডুয়া থেকে রওনা দেন দেবদাস গরুর গাড়িতে- সেই ভুবনমোহন জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। জমিদারের কাচারি বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই শারীরিক এবং মানসিক কষ্টে মারা যায় দেবদাস। পার্বতীকে কথা দিয়েছিল দেবদাস মৃত্যুর আগে একবার হলেও দেখা করবে। তাই ছুটে এসেছিল পার্বতী দরজা পর্যন্ত। কিন্তু শেষ দেখা হয়নি দেবদাস আর পার্বতীর।
প্রেমের ক্ষেত্রে দেবদাস হওয়াটাও মানুষের জীবনে ভুল। নিজের জ্ঞান এখানে বলছে, যে চাওয়া তোমার জন্যে ব্যর্থ, সেখানে ভুল করে চাওয়াটা ইতিহাস- কিন্তু ব্যক্তি জীবনে দুঃখের ভুলের বিশাল ভূমি। দেবদাসের বংশ ছিল পার্বতীর চেয়ে উঁচু। তাই জেদ করে তার মা জমিদারের সঙ্গে বিয়ে দেয়। প্রেমের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের জেদটাও একটা মহা ভুল। স্বামী বিবেকান্দ বলেছেন, মানুষের স্লেভারী অব সেন্স যখন স্লেভ হয়ে যায় তখন দাসত্বে পরিণত হয়, তখন এই দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে না।
এই একঘেয়েমি বিবেক আবেগে পরিণয়, পরিণতি মনকে প্রেমের দাসত্ব বানানো চরম ভুল। বাংলা গানে একজন গীতিকার লেখেছেন ‘ছায়াবাজি পুতুল রূপে বানাইয়া মানুষ, যেমনে নাচাও তেমনি নাচে, পুতুলের কী দোষ?’ তাই ভুলের দোষ নাকি প্রেমের দোষ প্রশ্ন রয়ে যায়…
ব্যক্তিগত পর্যায়ে বন্ধু নির্ণয়ে ব্যর্থ হচ্ছে সমৃদ্ধিশালী মনগুলো। বন্ধুদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠার পর সময় করে সব কথা আদান-প্রদান হয়ে থাকে, সেই ক্ষেত্রে ভুলের পরিধি ব্যাপক আকার ধারণ করে। এমনকি হতাহতের ঘটনা পর্যন্ত ঘটে যায়। মানসম্মান নিয়ে যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করে। তাই বন্ধু নির্ণয়েও সঠিক ভাবনার দরকার। মানুষের জীবনটা অদ্ভুত; তাই যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। প্রাকৃতিক যুদ্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধ, কর্মক্ষেত্রে যুদ্ধ, রাজনৈতিক যুদ্ধ, স্বপ্ন বুনতে যুদ্ধ, প্রেমের যুদ্ধ, ক্ষমতার পালাবদলের যুদ্ধ, মৌন যুদ্ধ, সব যুদ্ধ যুক্ত হয় না একসঙ্গে। লোভের মোহে স্বার্থের দখলবাজিতে মিথ্যাটাকে ভুল জেনেও ভুলেই থাকি। নিষিদ্ধের ঘরে প্রসিদ্ধ ভেবে জীবন কাটায় কত ফুল ভাবা ভুল মানুষদের আসা-যাওয়া দেখে। ইচ্ছে এবং মিথ্যের ভুলগুলো ঘৃণা জন্ম দেয়, শিক্ষার ভুলগুলো ইতিহাস সৃষ্টি করে।
মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাধারণ তত্ত্বের সমীকরণগুলো প্রকাশ করে যে মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি প্রসারিত বা সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু সে সময়ের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্ব স্থির এবং অপরিবর্তনীয়। এই ধারণাকে মেনে নিতে গিয়ে আইনস্টাইন তার সমীকরণে একটি অতিরিক্ত পদ যোগ করেন, যাকে তিনি ‘মহাজাগতিক স্থিরাংক’ নাম দেন। এই স্থিরাংকের উদ্দেশ্য ছিল মহাবিশ্বের গুরুত্বাকর্ষণ এবং প্রসারণের মধ্যে একটি ভারসাম্য স্থাপন করা যাতে মহাবিশ্ব স্থির থাকে।
১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখান যে, মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে; যা মহাবিশ্বের দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর রেডশিফ্ট অবলোকনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। হাবলের এই আবিষ্কারের পর, আইনস্টাইন স্বীকার করেন যে, তার সাধারণ তত্ত্বে মহাজাগতিক স্থিরাংক যোগ করা তার জীবনের ভুল’ ছিল।
ভুল আমাদের অভিজ্ঞতা দেয়, জ্ঞান দেয়, তাই ভুলটাকেও জ্ঞানীরা পাঠশালা মনে করেন। আমরা সাধারণ মানুষ ভুলকে মনে করি সর্বনাশ। ভুল সবক্ষেত্রে সর্বনাশ না। যেমনটি দেখি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে- নার্গিসের সঙ্গে কবির বিয়ের কথা ছিল কিন্তু বিয়ের আসর থেকেই পালিয়ে গিয়েছিলেন কাজী নজরুল। এর কয়েকদিন পর কবির উদ্দেশে চিঠি লেখেন নার্গিস। সেই চিঠির উত্তর নজরুল দিয়েছিলেন একটি গানের মাধ্যমে- ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই, কেন মনে রাখ তারে। ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।’ ভুল করেও নজরুল কি পেরেছিল নার্গিসকে ভুলে থাকতে?
আমরা জীবনে ভুল করেই বেঁচে থাকি। মুমিন ব্যক্তিরা মাবুদের কাছে প্রার্থনা করে কোনো পরীক্ষা নিও না; আমি ভুলে ভরা মানুষ। আমিও বলি আল্লাহ্ কোনো পরীক্ষা নিও না। যৌবনকালে নাফসের প্রতারণায় তরুণ-তরুণীরা অনেক ভুল করে। সেই ভুল ইহকাল-পরকাল দুই কালই অমঙ্গল। চারদিকে সর্বক্ষেত্রে ভুল, এই ভুলের কুয়াশার মাঝে মাঝে অন্ধকার দেখি। আলোর দিশারি কেবল গুরুর সান্নিধ্যের সময় সান্ত্বনা।
আক্রোশের সমাপ্তি ঘটিয়ে জনে জনে মানবতা, মানবিকতা, মায়া প্রেম, ভালোবাসার জগতে প্রবেশ করলে জগতে সব সুন্দর মনে হবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং লেখক থিওডোর রুজভেল্ট বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি জীবনে কখনো ভুল করেনি, সে জীবনে কোনো কাজই করেনি।’
ভুল করার কারণে আমরা প্রায়ই পুনরায় চেষ্টা করতে বা নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পাই। তা ঠিক না, মানুষের কাজ করতে গেলে ভুল হবে। ভুল আছে বলেই শুদ্ধতার এত দাম। মৃত্যুর কোনো ভুল নেই। মৃত্যুর চলাচল খুবই স্বাভাবিক ও নির্ধারকের দ্বারা নির্ধারিত।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ


























