প্রত্যাশা ডেস্ক: যত্ন নেওয়া দারুণ এক গুণ। এটা আমাদের মানুষ বানায়, আমাদের একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে, আর ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা দেয়। তবে যত্ন নেওয়ারও একটা সীমা আছে। সীমা ছাড়ালে আপনি ক্লান্ত, বিরক্ত আর মানসিকভাবে চাপে পড়ে যেতে পারেন। আপনার যদি এমন মনে হয়ে থাকে, তাহলে আছে অতিরিক্ত চাপ না নিয়ে যত্ন করার উপায়। তা হলো-
নিজের দায়িত্ব শেষ হওয়াটা বোঝা: কারো পাশে দাঁড়ানো আর তার পুরো জীবন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এক জিনিস নয়। কোনো বন্ধু সমস্যায় পড়লে আপনি তাকে সাপোর্ট করবেন। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত, ভুল বা আবেগ ঠিক করা আপনার কাজ না।
মনোবিজ্ঞানে একে বলে সুস্থ সীমারেখা (হেলদি বাউন্ডারিস)। আপনি কোথায় থামবেন আর অন্যজন কোথা থেকে শুরু করবে সেটা বুঝতে পারলে দুজনেই নিজেদের জীবন নিজের মতো সামলাতে পারবেন।
চেষ্টা করুন এভাবে- পরের বার যখন কারো সমস্যা সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করবে, তখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন- এটি কি আসলেই আমার দায়িত্ব?
সবাইকে খুশি করার চেষ্টা বন্ধ: সবার মন জেতা দেখতে ভালো শোনালেও আসলে সেটা ক্ষতিকর হতে পারে। যদি আপনার আত্মসম্মান নির্ভর করে অন্যরা আপনাকে কীভাবে দেখে তার ওপর, তাহলে আপনি সবসময় অতিরিক্ত কিছু করবেন আর অকারণে দুঃখপ্রকাশ করবেন।
সত্যি কথা হলো- আপনি যা-ই করুন না কেন, সবাই আপনাকে ভালোবাসবে না, সবাই একমত হবে না, সবাই আপনাকে অনুমোদন দেবে না। আর এটা একেবারেই স্বাভাবিক।
লক্ষ্য হওয়া উচিত সবার কাছে প্রিয় হওয়া নয়; বরং সবার সঙ্গে সৎ থাকা।
সব লড়াই না করা: প্রতিটি কথার জবাব দেওয়া দরকার নেই। প্রতিটি মতবিরোধ মেটানোও জরুরি না। অনেক কিছু না বলাই ভালো, যদিও আপনার ভেতরে ইচ্ছে করবে জিততে।
নিজেকে প্রশ্ন করুন- এক মাস পরও কি এটা গুরুত্বপূর্ণ হবে? যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে এতে শক্তি নষ্ট করার দরকার নেই।
ছোটখাটো বিষয় ছেড়ে দিলে আপনি বড় জায়গায় শক্তি ব্যবহার করতে পারবেন।
আসক্তি ছাড়ার শক্তি: বৌদ্ধ দর্শনে আছে অনাসক্তি (নন-অ্যাটাচমেন্ট)- মানে, আপনি কারো প্রতি যত্ন নেবেন, ফলাফলের সঙ্গে বাঁধা পড়বেন না। এটা মানে যত্ন না নেওয়া নয়; বরং ফলাফল আপনার শান্তি নষ্ট করবে না।
অনাসক্তি শান্তি রক্ষার দারুণ উপায়। এতে আপনি যুক্ত থাকবেন, কিন্তু পরিস্থিতির দাস হয়ে যাবেন না।
‘না’ বলতে শেখা: অনেক সময় আমরা ভাবি ‘না’ বলা খারাপ কিছু। তাই লম্বা ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চাই যে কেন পারছি না। কিন্তু বেশি ব্যাখ্যা দিলে অন্যরা তর্ক করার সুযোগ পায়—আপনার সীমারেখা ভাঙার পথ পেয়ে যায়।
একটা সহজ উত্তর যথেষ্ট- ‘এবার পারছি না।’ মনে রাখুন, ‘না’ নিজেই সম্পূর্ণ বাক্য।
অপ্রয়োজনীয় তথ্য বর্জন: আপনার মানসিক শক্তি তৈরি হয় আপনার চারপাশ থেকে—কথা, খবর, মিডিয়া, পরিবেশ। যদি সারাদিন নেতিবাচক খবর, গসিপ আর সমালোচনায় ভরা থাকে, তাহলে আপনি অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ভাবতে শুরু করবেন।
যেভাবে খাবার বাছাই করেন, সেভাবেই মনের খাবার বাছুন। যেসব মানুষ আপনাকে ভালো অনুভব করায় তাদের সঙ্গে সময় কাটান, আর যারা সবসময় নাটক করে তাদের এড়িয়ে চলুন।
সহানুভূতি আর আত্মত্যাগকে গুলিয়ে না ফেলা: সহানুভূতি মানে কারও সঙ্গে অনুভব করা; আত্মত্যাগ মানে এতটাই ডুবে যাওয়া যে আপনি নিজেকে হারিয়ে ফেললেন। প্রথমটি সম্পর্ককে গভীর করে, দ্বিতীয়টি আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলে।
একটা সহজ পরীক্ষা- কাউকে সাহায্য করার পর আপনি কি স্বস্তি পান, নাকি শক্তি ফুরিয়ে যায়? যদি ফুরিয়ে যায়, তবে বুঝবেন আপনি খালি কাপ থেকে ঢালছেন।
সহানুভূতি আর আত্মসম্মান একে অপরের বিপরীত না; বরং একে অপরের সঙ্গী।
নিয়ন্ত্রণ ছাড়া: অনেক সময় আমরা অতিরিক্ত যত্ন নিই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা থেকে। আমরা ভাবি, সবকিছু বা সবাইকে যদি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তাহলে খারাপ কিছু ঘটবে না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আসলে বেশিরভাগ সময়ই এক ধরনের ভ্রম। যত বেশি আঁকড়ে ধরবেন, তত বেশি হতাশ হবেন; বরং মন দিন যেগুলো আপনি আসলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন সেগুলোতে। যেমন- আপনার কাজ, আপনার মনোভাব, আপনার চেষ্টা। বাকিটা ছেড়ে দিন সময়ের হাতে।
একা থাকার গুরুত্ব: সব সময় সবার জন্য হাজির থাকলে আপনার মানসিক শক্তি খরচ হয়ে যায়। একা থাকার সময় কোনো স্বার্থপরতা নয়—এটাই আপনাকে নতুন করে শক্তি দেয়।
সকালে ১০ মিনিট ধ্যান হোক বা বিকেলের হাঁটা, এই ছোট ছোট একাকী সময় আপনাকে স্বচ্ছতা দেয়। এরপর সম্পর্ক আর দায়িত্বের কাছে আপনি আরো ধৈর্যশীল আর মনোযোগী হয়ে ফিরতে পারবেন।
শান্তিই সবচেয়ে দামি: শেষ পর্যন্ত শান্তি এমন কিছু নয় যা খুঁজে পাওয়া যায়—এটা এমন কিছু যা রক্ষা করতে হয়। আর এটাকে অনুমোদন, প্রশংসা বা সাময়িক স্বীকৃতির বিনিময়ে হারানো উচিত নয়।
যখন শান্তিকে আপনি একেবারে অ-আলোচনাযোগ্য (নন-নেগোশিয়েবল) করে নেবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই বেছে নিতে শিখবেন কার কাছে আর কোথায় আপনার শক্তি দেওয়া উচিত।
শেষ কথা: যত্ন নেওয়া জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। কিন্তু সীমাহীন যত্ন ভালোবাসাকে চাপের কাজে আর সদয়তাকে বিরক্তিতে পরিণত করে।
শান্তি রক্ষা মানে কাউকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিজের পুরো হৃদয় দিয়ে পাশে থাকা। তবে সেই হৃদয়কে চাপা না পড়তে দেওয়া। যখন এই ভারসাম্য রপ্ত করবেন, তখন এমন এক স্বাধীনতা আর স্বস্তি পাবেন- যা হয়তো আগে কল্পনাও করেননি।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ


























