আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে। এবার ১ হাজার ৯৭৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী শুরু করছেন প্রচার যুদ্ধ। তবে মানতে হচ্ছে ইসির আরচণ বিধি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা পেয়েছেন টানা ২০ দিনের প্রচারের সুযোগ। তা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। প্রচার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নামেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এরই মধ্যে সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্ষমতা নিয়ে সক্রিয় রয়েছে নির্বাচনি তদন্ত কমিটি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
নির্বাচনে ৩০০ আসনে ২ হাজার ৫৮০টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৫৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ছিল এবং ৭২৫ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে ৬৪৫ জন আপিল করেন এবং আপিল শুনানি শেষে প্রার্থিতা ফেরত পান ৪৩৭ জন। গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়ে সারা দেশে মোট ৩০৫ প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। তফসিল অনুযায়ী ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত এই প্রচার চালানো যাবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব প্রার্থী ও সংশ্লিষ্টদের আচরণ বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে ইসির পক্ষ থেকে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী কোনো প্রার্থী জনসভা করতে চাইলে প্রস্তাবিত সভার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে স্থান ও সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। জনসভাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং চলাচলের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বলা বাহুল্য, দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে নির্বাচন এখন প্রবেশ করেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মাঠের রাজনীতিতে। ভোট ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, জনমত ও গণতান্ত্রিক আস্থার প্রকৃত চিত্র এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহার, আপিল নিষ্পত্তি ও প্রতীক বরাদ্দ- এই প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকেই। এটি একদিকে যেমন নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহকে নির্দেশ করে, অন্যদিকে তেমনি মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ও জটিলতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। তবে আপিল নিষ্পত্তির মাধ্যমে বহু প্রার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়াকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা যায়।
এবারের নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ব্যালট পেপারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত। অতীত অভিজ্ঞতায় ইভিএম নিয়ে বিতর্ক, আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। সে তুলনায় ব্যালট পেপার পদ্ধতি ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচন কেবল একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়; এটি রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের পরীক্ষাও। প্রচারণার এই পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংযম। আইন ও আচরণবিধি মেনে সভা-সমাবেশ, পোস্টার-ব্যানার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার- সবক্ষেত্রেই প্রার্থীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচনী পরিবেশ যেন কোনোভাবেই সহিংসতা, ভয়ভীতি বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কলুষিত না হয়- এ দায়িত্ব কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদেরও। এবারের নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভোটার উপস্থিতি। অতীতের কয়েকটি নির্বাচনে ভোটারদের অনীহা ছিল স্পষ্ট। এর পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আস্থাহীনতা ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশের অভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। এই বাস্তবতায় প্রচারণার সময় প্রার্থীদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ভোটারদের আস্থা অর্জন করা।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আচরণবিধি বাস্তবায়ন, সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ এবং যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কমিশনকে তার নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। এখন থেকেই কমিশনের নজরদারি আরো সক্রিয় হওয়া জরুরি।
এই প্রচার কেবল ভোটের প্রস্তুতি নয়, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের সময়। শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে। আমাদের প্রত্যাশা, ভোটের প্রচারে প্রার্থীরা রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয় দেবেন।
কেএমএএ/সানা/আপ্র/২৪/০১/২০২৬

























