ঢাকা ০৯:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ব্যতিক্রমী রীতি: বিয়ের এক মাস আগে থেকে কনের কান্না

  • আপডেট সময় : ০৮:৫৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

লাইফস্টাইল ডেস্ক: বিয়ে মানেই হাসি, উৎসব আর আনন্দ-এমনটাই পরিচিত চিত্র। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের টুজিয়া জনগোষ্ঠীর কাছে বিয়ে শুরুর আগের সময়টা ভিন্ন আবেগে ভরা। সেখানে কনেকে বিয়ের এক মাস, কখনো আরো আগে থেকেই নিয়ম করে কাঁদতে হয়। এই কান্না কোনো শোকের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি একটি প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- যা পরিচিত ‘ক্রাইং ম্যারেজ’ নামে।

ঐতিহাসিকভাবে এই রীতির শিকড় রয়েছে চীনের কিং রাজবংশের শেষ সময় পর্যন্ত (১৬৪৪-১৯১১)। এক সময় এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকলেও আধুনিক নগরজীবনে এর চর্চা কমে এসেছে। তবে পাহাড়ি ও গ্রামীণ টুজিয়া সমাজে এখনো এই প্রথা গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। এই কান্না সাধারণ চোখের জল নয়, বরং সুরে সুরে গাওয়া বিশেষ ধরনের গান। কনে নিজেই এসব গান রচনা বা শেখে- যেখানে উঠে আসে তার শৈশব, পরিবার থেকে বিচ্ছেদ, ভবিষ্যৎ জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। আবেগের এই সংগীতময় প্রকাশকে কনের মানসিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হয়।

রীতির সময়কাল অঞ্চলভেদে ভিন্ন। অনেক জায়গায় বিয়ের এক মাস আগে থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে কাঁদার নিয়ম রয়েছে। প্রথমে কনে একা শুরু করলেও ধীরে ধীরে এতে যোগ দেন তার মা, দাদি-নানি ও পরিবারের অন্য নারী সদস্যরা। এই ধাপভিত্তিক অংশগ্রহণকে ‘জুও তাং’ বলা হয় অর্থাৎ নির্দিষ্ট ঘরে একত্রে বসে আবেগ প্রকাশ। কিছু এলাকায় আবার ‘টেন সিস্টার গ্যাদারিং’ নামে একটি আয়োজন হয়। সেখানে কনের বন্ধু ও আত্মীয়রা একত্র হয়ে কান্না ও গানের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানান। এটি শুধুই ব্যক্তিগত আবেগ নয় বরং পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সংহতির প্রতীক।

ওই প্রথার পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক তাৎপর্য। প্রাচীনকালে মেয়েদের বিয়ে প্রায়ই পারিবারিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হতো। ফলে কনের নিজের মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল। সেই সীমাবদ্ধতার ভেতর কান্না হয়ে উঠেছিল তার অনুভূতি, আপত্তি ও প্রত্যাশা জানানোর একমাত্র ভাষা। অনেক সময় এই গানের কথায় ঘটক বা সামাজিক নিয়মের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ পেত। এই সময় কনে যথেষ্ট কান্না না করলে সমাজে তাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো;এমনকি পরিবার থেকেও চাপ আসত। তাই এই কান্না কেবল আবেগ নয়, সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

আজকের দিনে এই রীতি অনেকটাই প্রতীকী রূপ নিয়েছে। তবুও টুজিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কান্না, গান আর সমবেত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কনে তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে এক সুতোয় গেঁথে নেয়- যা এই অনন্য বিয়ের রীতিকে করে তুলেছে বিশ্ব সংস্কৃতির এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

আজকের প্রত্যাশা/ কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

ব্যতিক্রমী রীতি: বিয়ের এক মাস আগে থেকে কনের কান্না

আপডেট সময় : ০৮:৫৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

লাইফস্টাইল ডেস্ক: বিয়ে মানেই হাসি, উৎসব আর আনন্দ-এমনটাই পরিচিত চিত্র। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের টুজিয়া জনগোষ্ঠীর কাছে বিয়ে শুরুর আগের সময়টা ভিন্ন আবেগে ভরা। সেখানে কনেকে বিয়ের এক মাস, কখনো আরো আগে থেকেই নিয়ম করে কাঁদতে হয়। এই কান্না কোনো শোকের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি একটি প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- যা পরিচিত ‘ক্রাইং ম্যারেজ’ নামে।

ঐতিহাসিকভাবে এই রীতির শিকড় রয়েছে চীনের কিং রাজবংশের শেষ সময় পর্যন্ত (১৬৪৪-১৯১১)। এক সময় এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকলেও আধুনিক নগরজীবনে এর চর্চা কমে এসেছে। তবে পাহাড়ি ও গ্রামীণ টুজিয়া সমাজে এখনো এই প্রথা গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। এই কান্না সাধারণ চোখের জল নয়, বরং সুরে সুরে গাওয়া বিশেষ ধরনের গান। কনে নিজেই এসব গান রচনা বা শেখে- যেখানে উঠে আসে তার শৈশব, পরিবার থেকে বিচ্ছেদ, ভবিষ্যৎ জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। আবেগের এই সংগীতময় প্রকাশকে কনের মানসিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হয়।

রীতির সময়কাল অঞ্চলভেদে ভিন্ন। অনেক জায়গায় বিয়ের এক মাস আগে থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে কাঁদার নিয়ম রয়েছে। প্রথমে কনে একা শুরু করলেও ধীরে ধীরে এতে যোগ দেন তার মা, দাদি-নানি ও পরিবারের অন্য নারী সদস্যরা। এই ধাপভিত্তিক অংশগ্রহণকে ‘জুও তাং’ বলা হয় অর্থাৎ নির্দিষ্ট ঘরে একত্রে বসে আবেগ প্রকাশ। কিছু এলাকায় আবার ‘টেন সিস্টার গ্যাদারিং’ নামে একটি আয়োজন হয়। সেখানে কনের বন্ধু ও আত্মীয়রা একত্র হয়ে কান্না ও গানের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানান। এটি শুধুই ব্যক্তিগত আবেগ নয় বরং পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সংহতির প্রতীক।

ওই প্রথার পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক তাৎপর্য। প্রাচীনকালে মেয়েদের বিয়ে প্রায়ই পারিবারিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হতো। ফলে কনের নিজের মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল। সেই সীমাবদ্ধতার ভেতর কান্না হয়ে উঠেছিল তার অনুভূতি, আপত্তি ও প্রত্যাশা জানানোর একমাত্র ভাষা। অনেক সময় এই গানের কথায় ঘটক বা সামাজিক নিয়মের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ পেত। এই সময় কনে যথেষ্ট কান্না না করলে সমাজে তাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো;এমনকি পরিবার থেকেও চাপ আসত। তাই এই কান্না কেবল আবেগ নয়, সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

আজকের দিনে এই রীতি অনেকটাই প্রতীকী রূপ নিয়েছে। তবুও টুজিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কান্না, গান আর সমবেত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কনে তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে এক সুতোয় গেঁথে নেয়- যা এই অনন্য বিয়ের রীতিকে করে তুলেছে বিশ্ব সংস্কৃতির এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

আজকের প্রত্যাশা/ কেএমএএ