ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালুকাময় মরুভূমিতে যখন যুদ্ধের দামামা আর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বিষাক্ত ধোঁয়া একসঙ্গে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে, তখন প্রশান্ত মহাসাগরের ওপার থেকে বেইজিংয়ের দৃষ্টি অত্যন্ত স্থির, শীতল এবং গাণিতিক। ২০২৫ সালের শেষভাগে ইরানের রাজপথে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন গগনচুম্বী মূল্যস্ফীতি, তীব্র জ্বালানি সংকট আর মুদ্রাস্ফীতির সীমানা ছাড়িয়ে এক গভীর রাজনৈতিক ক্লান্তিতে রূপ নিল, তখন পশ্চিমা বিশ্বের নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমগুলো একে ‘শাসন ব্যবস্থার অন্তিম লগ্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি।
ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন সর্বত্রই তখন তেহরানের ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে। কিন্তু বেইজিংয়ের গ্রেট হলের অন্দরমহলে এই দৃশ্যপটকে কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ‘বিপ্লব’ হিসেবে দেখা হয়নি। চীনা বিশ্লেষকদের কাছে এটি ছিল গত জুনে ঘটে যাওয়া ১২ দিনের প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধের এক অনিবার্য ‘রাজনৈতিক পরকম্পন’। বেইজিংয়ের স্ট্র্যাটেজিক ডকট্রিনে ইরানের এই অস্থিরতা শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী বাহ্যিক সামরিক চাপ, পঙ্গুত্বকারী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক অনিশ্চয়তার এক সম্মিলিত ফলাফল; যেখানে পশ্চিমারা এই বিক্ষোভের মাঝে ‘গণতন্ত্রের পদধ্বনি’ শুনতে পায়, বেইজিং সেখানে দেখতে পায় রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার এক সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক ছক।
চীনের ওই দৃষ্টিভঙ্গি কোনো সাময়িক সহানুভূতি নয়, বরং এক সুদূরপ্রসারী ‘ড্রাগন ডকট্রিন’-এর অংশ। তারা মনে করে, ইরানের অভ্যন্তরীণ ফাটলগুলো যতটা না সামাজিক- এর চেয়ে বেশি বাহ্যিক আগ্রাসনের ক্ষত। ফলে তেহরানের এই সংকটময় মুহূর্তে বেইজিংয়ের অবস্থান শুধু একজন দর্শক হিসেবে নয়, বরং এক নিঃশব্দ কিন্তু প্রভাবশালী অংশীদার হিসেবে। এই প্রবন্ধে আমরা অন্বেষণ করব- কেন চীন ইরানকে রক্ষা করতে নিজের সামরিক শক্তি নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বর্মকে বেছে নিয়েছে এবং কীভাবে ইরানের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন বেইজিংয়ের নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
অস্থিরতার ব্যবচ্ছেদ: চীনের কৌশলগত ও গাণিতিক পর্যবেক্ষণ
চীনা নিরাপত্তা মহলের চোখে ইরানের বর্তমান অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ফাটল নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা বহুমুখী যুদ্ধের অংশ। বেইজিংয়ের গোয়েন্দা ও নীতিনির্ধারকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই ইরানের ওপর যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, তার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়া। তবে পশ্চিমারা যখন একে ‘জনগণের বসন্ত’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছিল, বেইজিং তখন অত্যন্ত গাণিতিক নির্লিপ্ততায় বিক্ষোভের আকার ও সাংগঠনিক সক্ষমতা পরিমাপ করছিল।
চীনা গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী বিক্ষোভগুলো ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হলেও প্রতিটি কেন্দ্রে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল রাষ্ট্রের ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অপ্রতুল। চীনের নিজস্ব নিরাপত্তা দর্শনে ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ’ ও ‘সহিংস বিশৃঙ্খলার’ মধ্যে একটি দুর্ভেদ্য রেখা টানা থাকে। বেইজিং মনে করে, সরকারি অবকাঠামো বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। ফলে তেহরান যখন কঠোর হস্তে এই বিশৃঙ্খলা দমনের পথ বেছে নেয়, বেইজিং তাকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে নয়; বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক আত্মরক্ষা’ হিসেবে বিবেচনা করে। এই কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গিই ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার পশ্চিমা প্রচেষ্টায় বেইজিংয়ের নীরব ও অবিচল সমর্থনের মূল ভিত্তি।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির ‘সুরক্ষা কবচ’
২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীন ও ইরানের সম্পর্ক শুধু আদর্শিক বন্ধুত্বের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি এখন একটি নিরেট অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সুরক্ষা বলয়। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত সেই ঐতিহাসিক ‘২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি’ এখন বেইজিংয়ের জন্য শুধু একটি দলিলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি চীনের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরান থেকে চীনের তেল আমদানির পরিমাণ দৈনিক ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে; যা চীনের বিশাল শিল্পায়নের চাকা সচল রাখতে অক্সিজেনের মতো কাজ করে। ওয়াশিংটন যখন ইরানের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বা নতুন নিষেধাজ্ঞার খড়গ ঝোলায়, বেইজিং তাকে নিছক তেহরানকেন্দ্রিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখে না। বরং তারা একে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শৃঙ্খলিত করার একটি বৈশ্বিক মার্কিন চাল হিসেবে চিহ্নিত করে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মানচিত্রে ইরান হলো সেই কৌশলগত সংযোগস্থল; যা ধসে পড়লে চীনের পশ্চিমমুখী বাণিজ্যিক করিডোর এক অন্ধকার অনিশ্চয়তায় তলিয়ে যাবে। তাই ইরানকে রক্ষা করা চীনের কাছে কোনো দয়া নয়, বরং নিজের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যকে নিরাপদ রাখার এক অনিবার্য কৌশল।
চূড়ান্ত সংকট: যুদ্ধ শুরু হলে চীনের ভূমিকা ও ‘হিসাবি বাস্তববাদ’
বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-যদি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের ওপর সামরিক চড়াও হয়, তবে চীন কি রণক্ষেত্রে নামবে? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বেইজিংয়ের ‘ক্যালকুলেটেড রিয়ালিজম’ বা হিসাবি বাস্তববাদের গভীরে।
চীনা সামরিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী ইরান ও ইসরায়েলের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা এমন এক পর্যায়ে আছে- যেখানে পরবর্তী যুদ্ধ হবে নজিরবিহীন নিষ্ঠুর ও ধ্বংসাত্মক। কিন্তু চীন এই যুদ্ধে সরাসরি কোনো পক্ষের হয়ে সৈন্য বা যুদ্ধবিমান পাঠাবে না। এর পেছনে রয়েছে বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি দুটি কৌশল। তা হলো-
১. সার্বভৌমত্ব ও হস্তক্ষেপহীনতা: চীন ঐতিহাসিকভাবেই অন্য দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে নিজের সামরিক শক্তি ক্ষয় করার বিরোধী। তারা বিশ্বাস করে, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ শুধু বিশৃঙ্খলাই বৃদ্ধি করে।
২. বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার স্বার্থ: যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সামরিক সংঘাত চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব লাভের উচ্চাকাঙক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। তবে চীনের এই ‘সামরিক নিস্পৃহতা’ মানেই ‘নিষ্ক্রিয়তা’ নয়। যুদ্ধের ময়দানে সেনা না পাঠালেও বেইজিং ইরানকে রক্ষা করবে তার ‘কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বর্ম’ দিয়ে। ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো শক্তিশালী জোটে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে চীন ইতোমধ্যে একটি ‘কূটনৈতিক ঢাল’ তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরু হলে বেইজিং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তেহরানের পক্ষে ‘ভেটো’ ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবে। এর পাশাপাশি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে তারা ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সচল রাখতে গোপনে ও প্রকাশ্যে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সরবরাহ অব্যাহত রাখবে। চীনের কৌশল পরিষ্কার- রণক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির দাবার বোর্ডে ইরানকে টিকিয়ে রাখাই হবে বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য।
পরিশেষে বলা যায়, বেইজিংয়ের পররাষ্ট্রনীতির দাবার বোর্ডে ইরান কোনো সাময়িক আবেগ বা মতাদর্শিক মিত্র নয়; বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল এবং অপরিহার্য ভূরাজনৈতিক উদাহরণ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন যে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ কখনোই স্থিতিশীলতা আনতে পারে না। বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক অভিধানে পশ্চিমা ধাঁচের ‘গণতন্ত্রায়ন’ বা ‘সরকার উৎখাত’ মানেই হলো অরাজকতা, যার বাস্তব ও নিষ্ঠুর উদাহরণ হিসেবে তারা লিবিয়া, সিরিয়া বা ইরাকের ধ্বংসস্তূপকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। চীন চায় না পারস্য উপসাগরের তীরে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হোক, যা তাদের বৈশ্বিক বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
চীনের বর্তমান মূল্যায়ন অনুযায়ী ইরান নজিরবিহীন চাপের মুখে থাকলেও রাষ্ট্র হিসেবে এটি এখনও ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়নি। এই সংকটকালে বেইজিংয়ের ভূমিকা হবে অনেকটা গ্র্যান্ডমাস্টারের মতো-অত্যন্ত সূক্ষ¥ ও দূরদর্শী। তারা হয়তো রাজাকে (তেহরান) সরাসরি রক্ষা করতে রণক্ষেত্রে নিজেদের ‘ঘোড়া’ বা ‘হাতি’ পাঠাবে না। কিন্তু পর্দার আড়ালে এমন এক অভেদ্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরি করবে যেন প্রতিপক্ষ কিস্তিমাত করার সাহস না পায়।
চীনের এই কৌশলী সমর্থনের মূলে রয়েছে নিরেট জাতীয় স্বার্থ। ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা বেইজিংয়ের কাছে এখন শুধু তেহরানের প্রতি সংহতি প্রকাশ নয়, বরং চীনের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখার নামান্তর। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার এই দ্বন্দে বেইজিং হয়তো সরাসরি তলোয়ার হাতে নামবে না, কিন্তু তারা নিশ্চিত করবে যেন তাদের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান উৎস এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ এই স্তম্ভটি কোনোভাবেই ধসে না পড়ে। শেষ পর্যন্ত চীনের ‘ড্রাগন ডকট্রিন’ আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, রণক্ষেত্রের বিজয়ের চেয়ে কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হলো আধুনিক কূটনীতির প্রকৃত সাফল্য।
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
sarkerjahangiralam78@gmail.com
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

























