বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি- যেখানে সৌরশক্তি হয়ে উঠেছে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের চাবিকাঠি। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এখন সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে এই পরিবর্তনের অংশ হয়ে জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎকে আরো টেকসই ও নিরাপদ করে তুলছে।
সরকার এখন সৌরশক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ২০৪০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের মোট উৎপাদন ব্যবস্থার অন্তত ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি, মূল্য নির্ধারণ ও জাতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশের শিল্প খাতেও সৌরশক্তি ব্যবহারের প্রভাব দৃশ্যমান। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের মতো শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া উৎপাদন সচল রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে ডিজেল জেনারেটরের বাড়তি খরচ ও পরিবেশ দূষণও শিল্পের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন রুফটপ সৌর প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। তবে শিল্প খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিদ্যুৎ সংরক্ষণ বা স্টোরেজ। মেঘলা দিনে কিংবা রাতে সৌরশক্তি ব্যবহার করতে হলে কার্যকর ব্যাটারি সিস্টেম অপরিহার্য। উন্নত স্টোরেজ ব্যবস্থা না থাকলে সৌরপ্রকল্পের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যায় না। ইনভার্টার বা অন্যান্য যন্ত্রাংশের মানও অত্যন্ত গ্ররুত্বপূর্ণ। আর্ক ফল্ট, সার্কিট সমস্যা বা অতিরিক্ত তাপের কারণে অনেক সময় অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা থাকে। শুরুতেই উচ্চ বিনিয়োগের খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং প্রযুক্তি উন্নতকরণের মতো বিষয়গুলো কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ গ্রিডে সৌরশক্তি একীভূত করা। ভোল্টেজ ওঠানামা, স্থিতিশীলতা ও টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতা প্রায়ই এসব প্রকল্পের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সমাধান দিতে পারে উন্নত ডিজিটাল পাওয়ার প্রযুক্তি। ডিজিটাল পাওয়ার হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহার- সবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ঝুঁকি পূর্বাভাস, অপচয় রোধ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
হুয়াওয়ে, সানগ্রো, হাইথিয়াম এনার্জি স্টোরেজ টেকনোলজি, সোলার ইপিসি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, ভার্টসিলা এবং এইচএনবিসি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আধুনিক ডিজিটাল পাওয়ার সমাধান সরবরাহ করছে।
সার্জ প্রটেকশন অতিরিক্ত ভোল্টেজ থেকে ইনভার্টার ও সোলার সিস্টেমকে রক্ষা করে। লিকেজ শনাক্তকরণ সিস্টেম ভুল পথে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে সতর্কবার্তা দেয় বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়। স্ট্রিং-লেভেল ডিসকানেকশন কোনো একটি স্ট্রিংয়ে (সোলার প্যানেলের সিরিজ) সমস্যা হলে সেটিকে আলাদা করে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর পাশাপাশি রেটেড (ধুলা ও পানিরোধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান) টেকসই ডিজাইন ও স্মার্ট কুলিং সিস্টেমের কারণে এটি তাপমাত্রার মধ্যেও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম। হুয়াওয়ের অন্যান্য ইনভার্টারগুলোতেও একই ধরনের উন্নত ফিচার রয়েছে।
রেটেড কাঠামো ধুলা ও পানি থেকে সুরক্ষা দেয়। ফলে এগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন জলবায়ুতে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে সক্ষম। এ ছাড়া হুয়াওয়ের প্ল্যাটফর্মটি সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও এনার্জি স্টোরেজ ইউনিটকে একত্রিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করে তোলে। অ্যাপ বা ওয়েব ইন্টারফেসের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা রিয়েল টাইমে বিদ্যুৎ প্রবাহ পর্যবেক্ষণ, ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কোনো সৌরপ্যানেলে সমস্যা দেখা দিলে, ধুলো জমলে বা উৎপাদন হ্রাস পেলে এটি তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কবার্তা পাঠায়।
বাংলাদেশে জ্বালানির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর। সরকারের নীতি সহায়তা, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের অর্থায়ন, ইপিসি কোম্পানির প্রকল্প বাস্তবায়ন আর উন্নত প্রজুক্তির মাধ্যমে নতুন এক যুগে প্রবেশ করা সম্ভব। এটি শুধু পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হবে না, বরং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বাড়াবে। তাই বাংলাদেশে শিল্পখাতের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি কেবল ভবিষ্যৎ নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বর্তমান সময়ের এক বিশেষ দাবি।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

























