নিজস্ব প্রতিবেদক: চার দশকের বেশি সময় পর নতুন নেতা পেল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত এ দলের হাল ধরলেন তারই বড় ছেলে তারেক রহমান। যিনি লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে উদ্দীপ্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়।
গত ৪২ বছর বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর প্রয়াণে তাঁদের বড় ছেলে তারেক রহমানের শীর্ষ পদে আসা দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অবধারিতই ছিল।
খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারাগারে যাওয়ার পর প্রায় সাত বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদবী নিয়ে তারেকই মূলত দল চালিয়ে আসছিলেন। মায়ের মৃত্যুর দুই সপ্তাহের মাথায় তাকে দলের শীর্ষ পদে বসানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো।
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ খালেদা জিয়া ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গেল ৩০ ডিসেম্বর ভোরে মারা যান। এরপর তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করতে বাকি ছিল কেবল দলের সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত।
শুক্রবার রাত ১০টা ৪০ মিনিটে স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আজকে রাত ৯টায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে এবং চেয়ারম্যান দল পরিচালনার ক্ষেত্রে যেন সফল হতে পারেন সেজন্য স্থায়ী কমিটি দোয়া করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব বলেন, ‘চেয়ারম্যান হলে আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকে না।’
এর আগে রাত ৯টায় তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
তারেক রহমান হলেন দলটির চতুর্থ চেয়ারম্যান। মাঝে তিন বছর বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্ব বাদ দিলে জিয়া পরিবারই এ দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় তারেক রহমানের দল পরিচালনার বিষয়টি তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেছেন, তারেক রহমান তার নিজ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত সফলভাবে বিএনপিকে পরিচালনা করেছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থান হয়েছে, তারও নেতত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান।
বিএনপির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তারেক রহমানের জীবনীতে লেখা হয়েছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি তার মায়ের সঙ্গে রাজপথে আন্দোলনে যোগ দেন এবং ১৯৮৮ সালে দলের বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় মায়ের সঙ্গে জেলায় জেলায় প্রচারে যোগদান করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে, তারেক রহমান স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা এবং সুশাসনের ওপর গবেষণা করার জন্য ঢাকায় একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করার কথা লেখা হয়েছে জীবনীতে। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলেও সরকারি কোনো পদে আসেননি তিনি। ২০০২ সালে তারেককে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে দলের স্থায়ী কমিটি।
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জরুরি অবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে যৌথ বাহিনী। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ১৩টি মামলা। যৌথ বাহিনীর হেফাজতে তাকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তারেক রহমানকে ভর্তি করা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে।
প্রায় আঠারো মাস পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের জামিনে মুক্তি পান তারেক। সেই রাতেই স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য’ লন্ডনে চলে যান তিনি। শুরু হয় নির্বাসিত জীবন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমান সংগঠনের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

এদিকে দেশে শুরু হয় বিএনপির দুঃসময়। ২০১০ সালে শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে উৎখাত হন তার মা খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়, রাজপথই হয় দলটির ঠিকানা। ২০১৫ সালে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয়, যা ছিল তার জন্য বড় ধাক্কা। সেই বৈরী সময়েও তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারেননি। এর মধ্যে তার পাসপোর্টের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। কয়েক ডজন মামলার আসামি বিএনপির এই নেতা তখন আদালতের দৃষ্টিতে পলাতক। তার পাসপোর্ট আর নবায়ন করা হয়নি। এক সময় শোনা যায়, তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সময়ে তারেকের বিরুদ্ধে আরো ৭২টি মামলা হয়। সব মিলিয়ে ৫টি মামলায় তার সাজার রায় আসে। এর মধ্যে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় জজ আদালত। হাই কোর্ট বাংলাদেশে তার বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে যেদিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়, সেদিনই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এরপর গত সাত বছর ধরে লন্ডন থেকে ভিডিও কলেই তিনি দল চালাচ্ছেন। আর দেশে ঝড়-ঝাপটা সামলে বিএনপিকে টিকিয়ে রেখেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীরসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা।
২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দেয়। কিন্তু দুই শর্তের কারণে তিনি কার্যত বন্দি ছিলেন বাসা আর হাসপাতালের জীবনে। রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে আর দেখা যায়নি।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি সাজা মওকুফ করে খালেদা জিয়াকে পুরোপুরি মুক্তি দেন। পরে উচ্চ আদালতও তাকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।
আওয়ামী লীগের আমলে দেওয়া বিভিন্ন রায়ে তারেক রহমানেরও সাজা হয়েছিল। সেসব মামলায় তিনি খালাস পান। তাতে তার দেশে ফেরার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গেলে সেখানে তার সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই তারা একমত হন, নির্বাচন হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
৩ নভেম্বর বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য আংশিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। সেখানে জানানো হয়, বগুড়া-৬ আসনে প্রথমবারের মতো ভোট করবেন তিনি। ওই ঘোষণার পর তারেকের দেশে ফেরার সম্ভাবনা জোরালো হয়। ২৩ নভেম্বর ফের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। এ অবস্থায় তারেক কেন ফিরছেন না, সেই প্রশ্ন আবার সামনে আসে।
গত ১২ ডিসেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা দেন, তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর দেশে আসবেন। অবশেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে কযেক লাখ কর্মী সমর্থকের উপস্থিতিতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তারেক বলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান।’
৩০ ডিসেম্বর তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান। পরদিন লাখো মানুষের উপস্থিতিতে সংসদ ভবনের সামনে জানাজা শেষে জিয়া উদ্যানে স্বামী খালেদা জিয়ার পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হন। ৭ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন; ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। সামরিক আইন প্রশাসক থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়।
ওই বছর ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ ঘোষণা করা হয়। ৩ জুন নির্বাচন দিয়ে ওই ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ থেকে প্রার্থী হয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি হন। নির্বাচনের তিন মাসের মাথায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
জাগদল, মশিউর রহমান যাদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন ন্যাপ, আবদুল হালিম-আকবর হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, আব্দুল মতিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি ও শাহ আজিজুর রহমানের মুসলিম লীগ বিলীন হয় তার বিএনপিতে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন। তার এক বছরের মধ্যে রাজনীতিতে আসেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া, তাকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। তখন বিএনপির চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালে বিএনপি হটিয়ে ক্ষমতা দখল করলে সাত্তারের অসুস্থতার মধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পদ নিয়ে দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন খালেদা। সেই থেকে আমৃত্যু তিনি চেয়ারপারসন পদে ছিলেন।
সানা/আপ্র/১০/০১/২০২৬





















