ঢাকা ০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণ

  • আপডেট সময় : ০৭:৫৭:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫১ বার পড়া হয়েছে

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার

সমসাময়িক মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আজ আর শুধু একটি কেন্দ্রীয় নৈতিক বা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি ক্রমশ একটি জটিল, বহুমাত্রিক এবং পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক সমীকরণের অংশে পরিণত হয়েছে। ফিলিস্তিনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু ঐতিহাসিক ও মানবিক কারণে নয়; এটি আঞ্চলিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসেব-নিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফলে ফিলিস্তিনের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে এবং এর প্রতিটি নীতি, সিদ্ধান্ত ও সংঘাত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির সংযোগকেন্দ্রে অবস্থান করছে।

ওই প্রেক্ষাপটে আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, মিশরসহ বিভিন্ন আরব দেশ তাদের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রাধান্যকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিন ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত নীতি নির্ধারণ করছে। কিছু রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিযুক্ত হলেও, অন্যরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করছে। তবুও ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ ফিলিস্তিনকে আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতার একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

ইরান ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ শক্তি সমর্থন ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করছে, যেখানে ইসরায়েল একই সময়ে প্রতিরোধ নীতির সঙ্গে কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সমঝোতার প্রয়োগকে সমন্বয় করছে। এই দিক থেকে ফিলিস্তিন শুধু একটি সংঘর্ষের ক্ষেত্র নয়; এটি একটি কৌশলগত পাঁজর, যেখানে অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক সঙ্গতি এবং সামরিক প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে বিবেচিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় শক্তি ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি ফিলিস্তিন ইস্যুর ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য কৌশলগত হস্তক্ষেপ চালাচ্ছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নীতি ও পদক্ষেপের সঙ্গে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের মিল বা বিরোধ ফিলিস্তিনকে কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখছে। ফলে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব শুধু মানবিক বা নৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, শক্তির ভারসাম্য ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরীক্ষা ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বোঝার জন্য শুধু সংঘাত ও মানবিক সংকট নয়; বরং আঞ্চলিক শক্তি বিন্যাস, বৈশ্বিক কৌশল এবং কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতির নীতিগত, কৌশলগত ও মানবিক মাত্রাগুলোকে বোঝার জন্য অপরিহার্য।

এক. আব্রাহাম চুক্তি ও আরব কূটনীতির রূপান্তর: ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে। ঐতিহাসিকভাবে আরব—ইসরায়েল সম্পর্ক ফিলিস্তিন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, আব্রাহাম চুক্তি সেই ধারাবাহিকতায় একটি স্পষ্ট বিচ্যুতি নির্দেশ করে।

ওই চুক্তির মাধ্যমে আরব রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেয়, যেখানে ফিলিস্তিন প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে গৌণ হয়ে পড়ে। এর ফলে আরব বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দুর্বল হয় এবং ফিলিস্তিন ইস্যু আরব কূটনীতির কেন্দ্রে থাকলেও তার কার্যকর প্রভাব সীমিত হয়ে যায়।

দুই. আরব বিশ্বের বিভক্ত অবস্থান ও কৌশলগত বাস্তবতা: আধুনিক আরব রাজনীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্নের প্রতি সমর্থন এখন আর সমজাতীয় নয়। একদিকে, কিছু রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করছে। অন্যদিকে, জনমত ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার কারণে ফিলিস্তিন প্রশ্নে আনুষ্ঠানিক সমর্থন বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এই দ্বৈততা আরব রাষ্ট্রগুলোর নীতিতে একটি সুস্পষ্ট টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে; যেখানে কূটনৈতিক স্বার্থ প্রায়শই নৈতিক অবস্থানকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আরব রাজনীতিতে প্রতীকী গুরুত্ব বজায় রাখলেও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

তিন. ইরান- ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান শক্তির ভারসাম্যে ইরান—ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। ইরান ফিলিস্তিন প্রশ্নকে শুধু আদর্শিক সমর্থনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। হামাস ও হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনের মাধ্যমে ইরান নিজেকে ফিলিস্তিন প্রতিরোধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থাপন করে, যা তাকে আরব বিশ্বের একটি অংশে নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা দেয়। অন্যদিকে, ইসরায়েল এই সমর্থনকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করে। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ইরান—ইসরায়েল দ্বন্দ্বের একটি প্রতীকী ও কৌশলগত মাত্রায় রূপ নেয়; যা সরাসরি ও পরোক্ষ সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

চার. বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকা ও কূটনৈতিক সমীকরণ: মধ্যপ্রাচ্যের এ পুনর্বিন্যাসে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এই নীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন প্রায়শই কৌশলগত সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

রাশিয়া ও চীন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ফিলিস্তিন প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে সমর্থনমূলক ভাষ্য ব্যবহার করলেও তাদের ভূমিকাও মূলত শক্তির ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। ফলে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নৈতিক সমাধানের বদলে বৃহৎ শক্তির রাজনীতির একটি উপাদানে পরিণত করেছে। কাজেই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আজ এক জটিল, বহুমাত্রিক এবং বহুস্তরীয় বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি আর শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত বা নৈতিক ইস্যুর সীমাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, আঞ্চলিক কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসেব-নিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

আব্রাহাম চুক্তি, আরব বিশ্বের বিভক্ত রাজনৈতিক অবস্থান, ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ- সব মিলিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যু আন্তর্জাতিক শক্তি রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বৈশ্বিক শক্তির দায়বদ্ধতার ওপর। অর্থাৎ শুধু আঞ্চলিক শক্তির প্রয়োগ বা সামরিক কর্মকাণ্ড নয়; বৈশ্বিক নীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি- এসবই ফিলিস্তিন ইস্যুর স্থায়ী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধানের জন্য অপরিহার্য।

ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন এমন এক কূটনৈতিক কাঠামো; যা কৌশলগত হিসেব-নিকাশ, শক্তির ভারসাম্য এবং স্বার্থের রাজনীতির বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক নীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে সমান গুরুত্ব দিতে সক্ষম।

ওই কাঠামো ন্যায্য সমঝোতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ এবং দায়বদ্ধ কূটনৈতিক উদ্যোগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। শুধুই তখনই ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে উদ্ভূত বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে পারবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনের অবস্থান শুধু ভূরাজনৈতিক বা কৌশলগত নয়; এটি আন্তর্জাতিক নৈতিকতা, আইন, স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শক্তির দায়বদ্ধতার এক বাস্তব পরীক্ষাক্ষেত্র। এই বাস্তবতা বোঝা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও ন্যায্য সমাধান অর্জন করা কঠিন।

লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণ

আপডেট সময় : ০৭:৫৭:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার

সমসাময়িক মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আজ আর শুধু একটি কেন্দ্রীয় নৈতিক বা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি ক্রমশ একটি জটিল, বহুমাত্রিক এবং পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক সমীকরণের অংশে পরিণত হয়েছে। ফিলিস্তিনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু ঐতিহাসিক ও মানবিক কারণে নয়; এটি আঞ্চলিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসেব-নিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফলে ফিলিস্তিনের অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে এবং এর প্রতিটি নীতি, সিদ্ধান্ত ও সংঘাত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির সংযোগকেন্দ্রে অবস্থান করছে।

ওই প্রেক্ষাপটে আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, মিশরসহ বিভিন্ন আরব দেশ তাদের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রাধান্যকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিন ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত নীতি নির্ধারণ করছে। কিছু রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিযুক্ত হলেও, অন্যরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করছে। তবুও ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ ফিলিস্তিনকে আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতার একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

ইরান ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ শক্তি সমর্থন ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করছে, যেখানে ইসরায়েল একই সময়ে প্রতিরোধ নীতির সঙ্গে কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সমঝোতার প্রয়োগকে সমন্বয় করছে। এই দিক থেকে ফিলিস্তিন শুধু একটি সংঘর্ষের ক্ষেত্র নয়; এটি একটি কৌশলগত পাঁজর, যেখানে অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক সঙ্গতি এবং সামরিক প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে বিবেচিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় শক্তি ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি ফিলিস্তিন ইস্যুর ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য কৌশলগত হস্তক্ষেপ চালাচ্ছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নীতি ও পদক্ষেপের সঙ্গে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের মিল বা বিরোধ ফিলিস্তিনকে কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখছে। ফলে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব শুধু মানবিক বা নৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, শক্তির ভারসাম্য ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরীক্ষা ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বোঝার জন্য শুধু সংঘাত ও মানবিক সংকট নয়; বরং আঞ্চলিক শক্তি বিন্যাস, বৈশ্বিক কৌশল এবং কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতির নীতিগত, কৌশলগত ও মানবিক মাত্রাগুলোকে বোঝার জন্য অপরিহার্য।

এক. আব্রাহাম চুক্তি ও আরব কূটনীতির রূপান্তর: ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে। ঐতিহাসিকভাবে আরব—ইসরায়েল সম্পর্ক ফিলিস্তিন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, আব্রাহাম চুক্তি সেই ধারাবাহিকতায় একটি স্পষ্ট বিচ্যুতি নির্দেশ করে।

ওই চুক্তির মাধ্যমে আরব রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেয়, যেখানে ফিলিস্তিন প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে গৌণ হয়ে পড়ে। এর ফলে আরব বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দুর্বল হয় এবং ফিলিস্তিন ইস্যু আরব কূটনীতির কেন্দ্রে থাকলেও তার কার্যকর প্রভাব সীমিত হয়ে যায়।

দুই. আরব বিশ্বের বিভক্ত অবস্থান ও কৌশলগত বাস্তবতা: আধুনিক আরব রাজনীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্নের প্রতি সমর্থন এখন আর সমজাতীয় নয়। একদিকে, কিছু রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তববাদী কূটনীতি অনুসরণ করছে। অন্যদিকে, জনমত ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার কারণে ফিলিস্তিন প্রশ্নে আনুষ্ঠানিক সমর্থন বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এই দ্বৈততা আরব রাষ্ট্রগুলোর নীতিতে একটি সুস্পষ্ট টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে; যেখানে কূটনৈতিক স্বার্থ প্রায়শই নৈতিক অবস্থানকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আরব রাজনীতিতে প্রতীকী গুরুত্ব বজায় রাখলেও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

তিন. ইরান- ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান শক্তির ভারসাম্যে ইরান—ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। ইরান ফিলিস্তিন প্রশ্নকে শুধু আদর্শিক সমর্থনের বিষয় হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। হামাস ও হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনের মাধ্যমে ইরান নিজেকে ফিলিস্তিন প্রতিরোধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থাপন করে, যা তাকে আরব বিশ্বের একটি অংশে নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা দেয়। অন্যদিকে, ইসরায়েল এই সমর্থনকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করে। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ইরান—ইসরায়েল দ্বন্দ্বের একটি প্রতীকী ও কৌশলগত মাত্রায় রূপ নেয়; যা সরাসরি ও পরোক্ষ সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

চার. বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকা ও কূটনৈতিক সমীকরণ: মধ্যপ্রাচ্যের এ পুনর্বিন্যাসে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। এই নীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন প্রায়শই কৌশলগত সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

রাশিয়া ও চীন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ফিলিস্তিন প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে সমর্থনমূলক ভাষ্য ব্যবহার করলেও তাদের ভূমিকাও মূলত শক্তির ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। ফলে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নৈতিক সমাধানের বদলে বৃহৎ শক্তির রাজনীতির একটি উপাদানে পরিণত করেছে। কাজেই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন প্রশ্ন আজ এক জটিল, বহুমাত্রিক এবং বহুস্তরীয় বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি আর শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত বা নৈতিক ইস্যুর সীমাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, আঞ্চলিক কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসেব-নিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

আব্রাহাম চুক্তি, আরব বিশ্বের বিভক্ত রাজনৈতিক অবস্থান, ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ- সব মিলিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যু আন্তর্জাতিক শক্তি রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিন সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বৈশ্বিক শক্তির দায়বদ্ধতার ওপর। অর্থাৎ শুধু আঞ্চলিক শক্তির প্রয়োগ বা সামরিক কর্মকাণ্ড নয়; বৈশ্বিক নীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি- এসবই ফিলিস্তিন ইস্যুর স্থায়ী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধানের জন্য অপরিহার্য।

ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন এমন এক কূটনৈতিক কাঠামো; যা কৌশলগত হিসেব-নিকাশ, শক্তির ভারসাম্য এবং স্বার্থের রাজনীতির বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক নীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে সমান গুরুত্ব দিতে সক্ষম।

ওই কাঠামো ন্যায্য সমঝোতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ এবং দায়বদ্ধ কূটনৈতিক উদ্যোগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। শুধুই তখনই ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে উদ্ভূত বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে পারবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনের অবস্থান শুধু ভূরাজনৈতিক বা কৌশলগত নয়; এটি আন্তর্জাতিক নৈতিকতা, আইন, স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শক্তির দায়বদ্ধতার এক বাস্তব পরীক্ষাক্ষেত্র। এই বাস্তবতা বোঝা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও ন্যায্য সমাধান অর্জন করা কঠিন।

লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ