নিজস্ব প্রতিবেদক: বইমেলায় শেষ শুক্রবারের ছুটির দিন সকাল থেকেই অভিভাবকদের সঙ্গে আসা শিশু-কিশোরদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে মেলার শিশুচত্বর। তবে এবারের মেলায় সিসিমপুর না থাকায় সমাপনী শিশুপ্রহর ছিল অনেকটা প্রাণহীন।
এ ছাড়া এবারের মেলা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন লেখক ও প্রকাশকরা। প্রথম দিন থেকেই এত মানুষ এলো মেলায়, আশা ছিল বিক্রি ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। বই বিক্রি গতবারের তুলনায় অর্ধেকের কম।
শেষ দিন শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় খোলে বইমেলার দুয়ার। দুপুর ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। মাস পেরিয়ে আসা মেলার শেষ দিনে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টলে বিক্রয়কর্মীদের চেহারায় ছিল ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ।
ধানমন্ডি থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে বইমেলায় এসেছিল সামিহা আনজুম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সামিহা মায়ের সঙ্গে সেলফি তুলছিল। এবার মেলায় সিসিমপুর না থাকায় মন খারাপ হওয়ার কথা জানায় সে।
সামিহা বলে, প্রতিবছরই বইমেলায় আসি, কিছু বইও কিনি। তবে এবার পছন্দের অনেক লেখক নেই মেলায়। বইয়ের সংখ্যাও কম। মেলায় সিসিমপুরও নেই। কেমন জানি, প্রাণ নেই।
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক লেখকই এবার মেলায় আসেননি। পঙ্খীরাজের প্রকাশক দেওয়ান আজিজ বলেন, এবার সামগ্রিকভাবেই মেলা হতাশ করেছে। আশানুরূপ বিক্রি হয়নি।
মেলার শিশু চত্বরটি এবার আরও রঙিন করে সাজানো হয়েছিল খুদে পাঠকদের জন্য। বাংলা একাডেমির উল্টো দিকের প্রবেশ পথ দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করলেই হাতের ডান দিকে চোখে পড়ে শিশু চত্বর লেখা প্রবেশ পথ।
মেলার ভেতরে যেতেই চোখে পড়ে শিশুদের ছোটাছুটি। এ বছর শিশু চত্বরে শিশুদের জন্য ৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১২০টি ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই চত্বরের বাইরেও শিশুতোষ বইয়ের কিছু প্রকাশনীর স্টল রয়েছে। শিশুতোষ বইয়ের কয়েকটি প্রকাশনীর স্টলের বিক্রয়কর্মীরা জানিয়েছেন, বিক্রি আশানুরূপ হয়নি। দোলনের প্রকাশক কামাল মুস্তাফা বলেন, বইমেলা নিয়ে আগামী বছর আরও ভাবা উচিত।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী ও লেখক মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, একটা ভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে মেলা হচ্ছে। তাই সবার মনেই একটা দ্বিধা-সন্দেহ ছিল। কিন্তু স্রোতের মতো মানুষ এসেছে। বেচাকেনা কম হয়েছে বটে, তবে বইয়ের সান্নিধ্য পেতে এত মানুষের মেলায় আসাটাও ইতিবাচক বিষয়। এখন বই না কিনলেও হয়তো ভবিষ্যতে কিনবেন। তবে মেলার আয়োজন নিয়ে বাংলা একাডেমির পেশাদারত্বের মান আরও বাড়াতে হবে। সারা বছর কোনো পরিকল্পনা নেই, শুরুর আগে দিয়ে তড়িঘড়ি করে মেলা করার এই রীতি বদলাতে হবে। তিনি বলেন, মেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট লোকবল থাকার দরকার, যারা একটি মেলা শেষ হওয়ার পর থেকেই ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো পর্যালোচনা করে আগামী মেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
এই লেখকের ভাষ্য, মেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট লোকবল থাকার দরকার, যারা একটি মেলা শেষ হওয়ার পর থেকেই ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো পর্যালোচনা করে আগামী মেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবেন। পাশাপাশি মেলার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা বাংলা একাডেমির নিজস্ব বাজেট থাকতে হবে। এযাবৎ স্পনসর ও প্রকাশকদের অর্থে এই মেলা হচ্ছে। স্পনসরের ওপর বেশি নির্ভর করতে গিয়ে এবার মেলায় নানা রকম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মেলার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ন হয়েছে।
প্রতি বছরই মেলায় স্টল বাড়ানো হচ্ছে, মান যাচাই করা হচ্ছে না। এতে করে মেলা মানহীন হয়ে যাচ্ছে। মানসম্পন্ন প্রকাশনীকে নিয়েই বইমেলা হওয়া উচিত।
জুলাই-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মেলা কেমন হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকায় বিনিয়োগ করতে শঙ্কায় ছিলেন কোনো কোনো প্রকাশক। শেষ দিনে সেই শঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছে জানালেন একাধিক লেখক ও প্রকাশক।
‘প্রাণহীন’ উচ্ছ্বাসে শেষ হলো বইমেলা
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ