প্রত্যাশা ডেস্ক: দেশে শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের মধ্যে শীতজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ঠাণ্ডাজনিত জ্বরের পাশাপাশি শিশুদের ডায়রিয়া এবং বিভিন্ন ভাইরাসজনিত সংক্রমণও বেড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠায় এসব জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে তীব্র আকার ধারণের খবর পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে শীতজনিত রোগী মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের; বিশেষ করে সর্দি-কাশি না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করার পরামর্শ দেন তারা।
রাজধানীর মুগদা হাসপাতাল, শ্যামলী শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শীতজনিত কারণে নতুন রোগীর চাপ বেড়েছে। নিয়মিত যেসব রোগী থাকে তার চেয়ে কিছু বেড়েছে। আর যেসব রোগী আসছে, তাদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধ এবং বক্ষব্যাধিজনিত রোগের উপস্থিতি বেশি।
কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মারুফ কামাল জানান, দু’দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শীত এলেই অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, সর্দিকাশি বেড়ে যায়। গত কয়েক দিন শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ইনহেলার ব্যবহার করেও শ্বাসকষ্ট নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলেন না। তাই ঢামেকে ভর্তি হয়েছেন।
মুগদা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দুই বছরের শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন মাণ্ডার বাসিন্দা রফিক। শিশুটির কাশি বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে আনা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে প্রাথমিকভাবে নেবুলাইজ করে ছেড়ে দেন। নেবুলাইজেশনের পর কাশিটা কমেছে। এদিকে শ্যামলী শিশু হাসপাতালেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিন তুলনামূলকভাবে বেশি রোগী আসছে।
উত্তরার দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা গোলাম সাত্তারের নাতি রাফসান (৩) কয়েকদিন ধরে সর্দিকাশিতে ভুগছে। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় প্রাইভেট চেম্বারে দেখানো হয়। চিকিৎসক তাকে এন্টিবায়োটিক দিয়েছেন। এতে কাশি কমলেও খাবারের রুচি কমে গেছে এবং দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঠিক হয়ে যাবে বলে চিকিৎসক আশ্বাস দিলেও পরিবারের লোকজনের দুশ্চিন্তা কাটছে না।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী ২৬১ জন শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। একই সময়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৫৭ জন। এ ছাড়া সাধারণ সর্দি-কাশিতে ৮১৬ এবং হাঁপানিতে ১২১ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। হাসপাতালটিতে একদিনেই বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ২৩৪টি শিশু। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা পেয়েছে ২৬০ জন, মেডিসিন বিভাগে ৭৯২ এবং সার্জারি বিভাগে ১৮২ জন। ২৪ ঘণ্টায় সর্দিকাশিতে ২৫৩ জন, নিউমোনিয়ায় ৪৬, হাঁপানিতে ২৩, স্ক্যাবিসে ১৫৩, অন্যান্য চর্মরোগে ২২৩ এবং ডায়রিয়ায় ৫৪টি শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক জানান- শীতের তীব্রতা বাড়লেও এভারেজ যেমন রোগী থাকে, তেমন রোগীই আসছে। গতকাল শনিবার কিছুটা বেশি রোগী ছিল বলে জানান তিনি।
শীতজনিত রোগে করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে ইমেরিটাস প্রফেসর ডা. এবিএম আবদুল্লাহ জানান, শীত মৌসুমে শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ; বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা। এক্ষেত্রে প্রয়োজন না হলে তাদের বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে যেতেই হলে অবশ্যই গরম কাপড় পরতে হবে। মাথা, কান ও গলা ভালোভাবে ঢেকে রাখা জরুরি। যারা বয়স্ক কিংবা যাদের বাইরে শ্রমিকের কাজ করতে হয়, তাদের জন্য এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বয়স্কদের যতটা সম্ভব বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। ঘরে থাকলেও দরজা-জানালা ঠিকভাবে বন্ধ রেখে ঘর উষ্ণ রাখতে হবে। হিটার বা গরম রাখার ব্যবস্থা থাকলে তা ব্যবহার করা ভালো।
শিশুদের বিষয়ে ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, স্কুল বন্ধ থাকলে বাইরে দৌড়াদৌড়ি এড়িয়ে চলতে হবে। শিশুদের কুসুম গরম পানি পান করানো উচিত। একইভাবে গর্ভবতীদের জন্য শীতকালীন সুরক্ষা আরো জরুরি। কারণ এই সময় তাদের শীতজনিত জটিলতার ঝুঁঁকি বেশি থাকে। যাদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস বা শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগ রয়েছে; তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হরে। এর পাশাপাশি চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করা উচিত। বর্তমানে সর্দি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাশি বা জ্বর চার-পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিজের ইচ্ছায় কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, প্রতি বছর শীত মৌসুম ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তনের কিছু প্রভাব ইতিবাচক হলেও কিছু প্রভাব নেতিবাচক হয়; যা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, শীতের তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতিতে বিদ্যমান কিছু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে একদিকে যেমন সর্দি-কাশি, ঠাণ্ডাজনিত জ্বর ও নিউমোনিয়ার মতো রোগ দেখা দেয়, অন্যদিকে তেমনি শিশুদের মধ্যে পেটের অসুখ ও ভাইরাসজনিত পাতলা পায়খানার প্রবণতাও বেড়ে যায়।
ডা. লেলিন জানান, মানুষের গলার ভেতরে স্বাভাবিকভাবে বসবাসকারী কিছু জীবাণু রয়েছে। এর একটি অংশ হলো সুবিধাবাদী বা অপরচুনিস্ট ব্যাকটেরিয়া। শীতের তাপমাত্রা পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে এসব জীবাণু গলায় সংক্রমণ ঘটায়। এতে টনসিলের প্রদাহ, গলযন্ত্রের প্রদাহ বা ফ্যারিনজাইটিস দেখা দেয়। এ ছাড়া শীতে ভাইরাসজনিত ও ব্যাকটেরিয়াজনিত- উভয় ধরনের নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে সর্দি-কাশি ও ভাইরাসজনিত পাতলা পায়খানার প্রকোপও দেখা যায়। তিনি বলেন- শীতে বড়দের ক্ষেত্রেও ঠাণ্ডা লাগা, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা ও নিউমোনিয়ার মতো সমস্যা বাড়ে। কখনো কখনো বড়দের মধ্যেও রোটা ভাইরাসজনিত পাতলা পায়খানার ঘটনা দেখা যায়। এসব থেকে রক্ষা পেতে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, হঠাৎ করে যেন ঠাণ্ডা না লাগে- এ জন্য পর্যাপ্ত শীতের পোশাক ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য শীতের মৌসুমি শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খাওয়া উচিত। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে শীতের বিরুদ্ধে শরীরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হবে।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ


























