প্রত্যাশা ডেস্ক: একজন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে কয়টি মোবাইল ফোন আছে, তা দেখা যাচ্ছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিফিকেশন রেজিস্টারে (এনইআইআর)। সেখানে গিয়ে নিজের নামে ৩০-৪০টি মোবাইল ফোন দেখে বিস্মিত অনেকে। তারা চিন্তিতও।
এ বিষয়ে একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে মাসুম বিল্লাহ ভূঁইয়া নামের এক ব্যক্তি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে ৫৩টি মোবাইল ফোন নিবন্ধন করা। এর মধ্যে চলতি মাস ডিসেম্বরেই নিবন্ধিত হয়েছে ৪২টি। যদিও তিনি দেশ থেকে মোবাইল ফোন কিনেছেন চার বছর আগে।
নিজের নামে ৩১টি মোবাইল ফোন কেনা হয়েছে উল্লেখ করে তোফায়েল খান নামের আরেক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আপনার আমার পারসোনাল তথ্যগুলোর কোনো সিকিউরিটি নেই।’
মোবাইল ফোন সেট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে চালু হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর)। এর উদ্দেশ্য হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কর ফাঁকি, অবৈধ ও নকল মোবাইল ফোন দেশে আসা ঠেকানো এবং অপরাধ দমনকে সামনে আনা হচ্ছে। অন্যদিকে বৈধ মোবাইল ফোনের দাম যাতে কমে, সে জন্য আমদানিতে কর কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, এনইআইআর চালুর ফলে অবৈধভাবে দেশে আসা ফোন আর নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি বিদেশ থেকে অবৈধভাবে আনা পুরোনো ফোনের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যাবে। এনইআইআর চালুর পর নিজের নামে কয়টি মোবাইল ফোন আছে, তা যাচাই করা যাচ্ছে https://neir.btrc.gov.bd/ ঠিকানায়। সেখানে গিয়ে অনেকেই দেখছেন, তাঁদের নামে ৩০-৪০টি করে মোবাইল ফোন রয়েছে।
বিশেষ সহকারী ফয়েজের ব্যাখ্যা: বিভ্রান্তি দূর করতে গত শুক্রবার দুপুরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এক ফেসবুক বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, তারা মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের কাছ থেকে ৩০০ কোটির বেশি ‘ডেটা সেট’ (উপাত্ত) পেয়েছেন। অর্থাৎ অপারেটররা হিস্টোরিক ডেটাসহ (এযাবৎকালের তথ্য) সবকিছুই ব্যবস্থায় তুলেছে। তবে মাইগ্রেশনের (স্থানান্তরের) তারিখটা এখনকার দেখানো হয়েছে বলে অনেকের এনআইডিতে সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে। ফয়েজ আহমদ আরো বলেন, বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে এ নিয়ে কাজ করছে। ধীরে ধীরে পুরোনো উপাত্ত ‘ব্যাকগ্রাউন্ডে আর্কাইভ’ করে শুধু বর্তমানে সচল মুঠোফোনের সংখ্যা দেখানো হবে। কিছুটা সময় লাগবে।
ব্যবস্থাটি নতুন নয় উল্লেখ করে ফয়েজ আহমদ বলেন, ২০২১ সালে এনইআইআর প্রথম চালুর চেষ্টা হয়েছিল। আগে ভিএপিটি (ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড পেনেট্রেশন টেস্টিং) করা হয়েছিল। তবে নতুন করে আরেকবার ভিএপিটি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের এই ব্যবস্থায় কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করে এখন সচল করা হয়েছে।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিটিআরসির সিস্টেমে এনআইডির সঙ্গে সরাসরি কোনো মোবাইল ফোনের আইএমইআই (মুঠোফোনের পরিচিতি নম্বর) যুক্ত থাকে না; বরং এটি সিমের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট এনআইডি দিয়ে কেনা সিম যে যে মুঠোফোনে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই সব মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বরই ওই এনআইডির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। একইভাবে একটি এনআইডির অধীনে যদি একাধিক সিম নিবন্ধিত থাকে, তবে ওই সব সিম দিয়ে অতীতে এবং বর্তমানে যতগুলো মোবাইল ফোন ব্যবহার করা হয়েছে, তার সব কটির আইএমইআই এখন একত্রে তালিকাভুক্ত হয়েছে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, ‘এনইআইআর নিয়ে প্যানিক করার কিছুই নেই। নতুন করে সরকার কিছু করেনি। শুধু এক্সিস্টিং ইনফরমেশনটাকে সারফেস করছি।’ তিনি আরো বলেন, এনইআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়নি। শুরুতে কিছুটা কারিগরি জটিলতা তৈরি হচ্ছে, এ জন্য গ্রাহকদের ধৈর্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। পুরোনো উপাত্তের বাইরে গত মাস ডিসেম্বরে কারও কারও নামে ফোন নিবন্ধন দেখাচ্ছে। যদিও তারা ডিসেম্বরে কোনো ফোন কেনেননি, সিমও অন্য ফোনে ব্যবহার করেননি। বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের অজান্তেই তাঁর এনআইডি ব্যবহার করে অন্য কেউ সিম নিবন্ধন করে নেন। এ কারণে একজনের নামে অনেক সিম ও সেট দেখাতে পারে। এটা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন মানুষ।
কেন এনইআইআর: দেশে এখন মাঝারি দামি ও বেশি দামি স্মার্টফোনের একটি বড় অংশ কর ফাঁকি দিয়ে আনা হয়। কারণ, করের হার বেশি বলে দেশে দাম অনেক বেশি পড়ে। এসব ফোন ‘আন-অফিশিয়াল’ নামে পরিচিত। যেমন একটি সুপরিচিত ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে একটি জনপ্রিয় মডেলের মুঠোফোনের দাম চাওয়া হয় ৬০ হাজার টাকা। পাশের দোকানে একই ফোন ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। দামের পার্থক্যের কারণে আন-অফিশিয়াল মোবাইল ফোন কেনার দিকে ঝোঁক বেশি। এতে দেশে মোবাইল ফোন সংযোজন ও উৎপাদনকারী কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীরা বলছেন, দেশে বছরে স্মার্টফোনের চাহিদা এক কোটির মতো এবং ফিচার ফোনের চাহিদা আড়াই কোটির মতো। দেশের মোট বাজারের ৪০ শতাংশই অবৈধ মুঠোফোনের দখলে। এ বাজার প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার। নকল মোবাইল ফোনও আমদানি হয়। কোম্পানিগুলোর আগ্রহের কারণেই ২০২১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এনইআইআর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়।
মোবাইল ফোন আমদানিতে করভার প্রায় ৬১ শতাংশ। দেশীয় সংযোজন ও উৎপাদনকারীদের সুরক্ষা দিতে সরকার এই উচ্চ হারে শুল্ক-কর আরোপ করে রেখেছে। এ কারণে মুঠোফোনের দাম আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি, যা বাড়িয়েছে কর ফাঁকি দিয়ে আমদানির প্রবণতা। কর ফাঁকি ঠেকাতে এনইআইআর চালুর দাবি করে আসছিল দেশীয় কোম্পানিগুলো।
অর্ন্তবর্তী সরকার এনইআইআর চালুর পাশাপাশি মুঠোফোনের কর কমানোর উদ্যোগও নেয়। ৬১ শতাংশ থেকে করভার প্রায় সাড়ে ৪৩ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তের কথা বৃহস্পতিবার জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। যদিও এনইআইআর চালুর বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন ব্যবসায়ী ও দোকানমালিকেরা, যারা আন-অফিশিয়াল মোবাইল ফোন বিক্রি করেন। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এনইআইআর চালু ১৬ ডিসেম্বর থেকে পিছিয়ে ১ জানুয়ারি (২০২৬) করা হয়। চালুর পর বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।
১১ লাখ সিম বন্ধ: বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটর সূত্র জানিয়েছে, এনইআইআর চালুর পর প্রায় ১১ লাখ সিম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্রাহকদের অভিযোগ ও মোবাইল অপারেটরদের বার্তা পেয়ে একপর্যায়ে বিটিআরসি সিমগুলো সচল করে দেয়। বিটিআরসি সূত্র জানায়, এনইআইআর চালুর সময় বিটিআরসি মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ‘হিস্ট্রিক্যাল ডেটা’ (এযাবৎকালের উপাত্ত) সংগ্রহ করে। এই ডেটা দিয়ে সিস্টেমটি পুরোপুরি সক্রিয় হতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু এই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপারেটরদের নিজস্ব ডেটাবেজ আরো আপডেট হয়ে যায়। ফলে সিস্টেমে থাকা ডেটা ও অপারেটরদের বর্তমান ডেটার মধ্যে এক দিনের একটি সময়ের ব্যবধান তৈরি হয়। এ অবস্থায় সিস্টেমটি যখন সচল হয়ে অপারেটরদের কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য নিতে শুরু করে, তখন অনিবন্ধিত বা নতুন কিছু ডেটা নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় প্রাথমিকভাবে আটকে যায়। এর ফলেই প্রায় ১১ লাখ সিম বা কেস সাময়িকভাবে স্থগিত অবস্থায় পড়ে। তবে সেটি সমাধান করা হয়েছে।
অপরাধ দমন হয় কি: অপরাধ দমনের কথা বলেই ২০১৬ সালে মোবাইল ফোন সিমের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন (আঙুলের ছাপসহ) বাধ্যতামূলক করে তৎকালীন সরকার। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের আঙুলের ছাপ নানা অজুহাতে চুরি করে সিম নিবন্ধন করা হচ্ছে। মুঠোফোনে প্রতারণা ও অপরাধের নানা ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ফয়েজ আহমদ যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা সন্তোষজনক মনে হয়নি। ঠিকমতো পরীক্ষা ছাড়া এ ব্যবস্থা চালু করা উচিত হয়নি। বিটিআরসির উচিত মানুষকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেওয়া, যাতে মানুষ জানতে পারে আসলে কী হয়েছে, একজনের নামে এত মোবাইল ফোন কেন। তিনি আরো বলেন, একজনের এনআইডির বিপরীতে তাঁর অগোচরে নিবন্ধিত মোবাইল ফোন দিয়ে অপরাধ হলে ব্যক্তির ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বি এম মইনুল আরো বলেন, ব্যক্তির সিমের সঙ্গে ফোনও যখন নিবন্ধিত হবে, তখন প্রোফাইলিং (ব্যক্তির সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য একত্র করে রাখা) করা সহজ হবে এবং নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। এসব সাধারণত ‘পুলিশি স্টেটে’ দেখা যায়।
সানা/আপ্র/০৩/০১/২০২৬



















