প্রত্যাশা ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক নগরের মেয়র নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়ে গেলো। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে ভোট চলার কথা। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সময়সূচি ভিন্ন হওয়ায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগে ভোটের ঠিক আগের দিন, সোমবার সন্ধ্যায়, সমর্থকদের উদ্দেশে শেষ মুহূর্তের বার্তা দেন তিনি।
গত সোমবারের (৩ নভেম্বর) সমাবেশে অ্যাস্টোরিয়ায় তারুণ্যে ভরা সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, অনেকের মাথায় ক্যাম্পেইনের পরিচিত হলুদ উইন্টার টুপি, আর সামনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভিড়- সব মিলিয়ে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
গত পাঁচ বছর ধরে নিউ ইয়র্ক কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়ায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন জোহরান মামদানির। মেয়র নির্বাচনের আগের দিন তাই তিনি ছুটে গেলেন সেখানেই। এখানেই জুনের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে নজিরবিহীন জয়ের পর প্রথম জনসমক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন ৩৪ বছর বয়সি এই স্টেট অ্যাসেম্বলিম্যান।
জাতীয় পর্যায়েও আলোচিত মুখ: মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট মামদানি এক প্রান্তিক প্রার্থী থেকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচিত মুখে পরিণত হয়েছেন। গত জুন মাসের দলীয় নির্বাচনে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ভোটার উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে মেয়র নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগের সব জরিপেই দেখা গেছে, নিউইয়র্ক শহরের সাবেক মেয়র অ্যান্ড্রু কুমোর চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মামদানি এগিয়ে রয়েছেন। মামদানি আশা করছেন, আগেরবারের মতো এবারও তরুণ ভোটাররা তাঁর পাশে থাকবেন। তবে শুধু নিউইয়র্কের মধ্যেই নয়, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলার তাঁর অঙ্গীকার পুরো দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সাড়া ফেলেছে। অনেক জেন-জি ও মিলেনিয়ালস প্রজন্মের মানুষ বলছেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গায় হাত রেখেছেন মামদানি। তরুণ প্রজন্ম যখন রাজনীতিকদের প্রতি আশা হারিয়ে ফেলেছেন এবং প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নতুন কণ্ঠস্বরের অপেক্ষায় আছেন, তখনই মামদানির উত্থান।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সার্কেলে তরুণ ভোটারদের নিয়ে গবেষণা করেন রুবি বেল বুথ। তিনি বলেন, ‘যখন কোনো প্রার্থী জনগণের উদ্বেগ নিয়ে কথা বলেন এবং সেই উদ্বেগকে স্বীকৃতি দেন, তখন সেটি বিশাল প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ক্ষেত্রে।’
ভোটের আগের দিনও শিশুদের হাসির শব্দে ভরা একটি খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে শেষ মুহূর্তের বার্তা দিলেন মামদানি। বললেন, এই হাতগুলোই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে- ইতিহাস তৈরি করার জন্য। প্রমাণ করতে যে শ্রমিক মানুষের জন্য লড়লে, তুমি নিজের শহরের রাজনীতিকে পাল্টে দিতে পারো।
রক্ষণশীলদের মধ্যেও জনপ্রিয়: রক্ষণশীল রাজ্য মিসিসিপিতে বসবাস করলেও লিয়া অ্যাশ সব সময়ই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়ে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হতাশ ও উপেক্ষিত বোধ করছেন। এই অনুভূতি আরো তীব্র হয়েছে তাঁর অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে। অন্যদিকে অ্যান্ড্রু টেইট ভার্জিনিয়ার এক গ্রামীণ এলাকায় একটি ছোট খামারে তাঁর সঙ্গী ও সন্তানদের নিয়ে থাকেন এবং স্থানীয় একটি কারখানায় কাজ করেন। তিনিও মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
অ্যাশ বলেন, ‘দেশের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য হয়েও মিসিসিপিতে বাড়ির দাম বেড়েই চলেছে। এটা সত্যিই মন খারাপ করে দেয়।’ তবু অ্যাশ আশা করছেন, যদি মামদানি নির্বাচনে জয়ী হন, তাহলে সেটি দেশের অন্যান্য শহরের ডেমোক্র্যাট নেতাদের জন্য একটি বার্তা হয়ে যাবে।
২০২৪ সালের নির্বাচন ট্রাম্প জিতেছিলেন মূল্যস্ফীতি ও ব্যয় সংকট নিয়ে জনঅসন্তোষ কাজে লাগিয়ে। কিন্তু মামদানির কথায়, প্রকৃত সমাধান আনতে পারবেন তিনি ও তার টিম- যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউ ইয়র্ককে বদলে দিয়ে।
মামদানি একজন মুসলিম অভিবাসী। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে তার নির্বাচনি প্রচারের মূল লক্ষ্য নিউ ইয়র্ককে আরো সাশ্রয়ী করা। তার ইশতাহারের মধ্যে রয়েছে বাসাভাড়া স্থগিত করা, সবার জন্য বিনামূল্যে শিশু পরিচর্যাসেবা এবং কম খরচের গণপরিবহণ সেবা চালু করা।
সতর্ক আশাবাদ: তবে যাঁরা নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন, তাঁদের কাছে মূল প্রশ্ন-মামদানি কি সত্যিই জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই সংকট কাটাতে পারবেন? ৩২ বছর বয়সী ডিলন রবার্টসনের জন্য অর্থনৈতিক উদ্বেগ যেন জীবনের স্থায়ী সঙ্গী। স্নাতক শেষে তাঁর শিক্ষাঋণ দাঁড়াবে প্রায় আড়াই লাখ ডলার। মামদানিকে সমর্থন করছেন রবার্টসন। কারণ, তাঁর প্রস্তাবিত ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনাগুলো জীবনকে কিছুটা সহজ করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি সংশয়ও প্রকাশ করেন। ডিলন বলেন, ‘মামদানি যা বলছেন, সবই শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু আমি ভাবি, তিনি কি সত্যিই পারবেন? বাস্তবে কি তা সম্ভব? নাকি এটা যেন ফুটো জাহাজে শুধু ব্যান্ডেজ লাগানোর মতো?’
তবু ডিলন স্বীকার করেন. যদি বিকল্প হয়, আগের মতোই টেনে নেওয়া অথবা কিছু নতুন চেষ্টা করা, তাহলে তিনি নতুনটাকেই সুযোগ দিতে প্রস্তুত।
এদিকে ভোটের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে সমর্থন দেন প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে। বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কও কুওমোর পাশে দাঁড়ান। প্রাইমারিতে মামদানির কাছে হেরে যাওয়ার পর তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
সাম্প্রতিক জরিপে মামদানি এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান কিছুটা কমেছে। কুওমো ইতোমধ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে ছেড়ে নিজের দিকে আসতে ডানপন্থীদের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে শেষ মুহূর্তের সমর্থন পরিবর্তন নির্বাচনকে আরো অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। তবু সোমবার মামদানি সমর্থকদের আশা- এই প্রচারণা হবে নিউ ইয়র্ক রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত, কর্পোরেট-নির্ভর ডেমোক্র্যাটিক কাঠামোর বিরুদ্ধে তীব্র বার্তা। নগরবাসী অপেক্ষায়-নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় কি লেখা হবে? সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা
সানা/আপ্র/০৪/১১/২০২৫



















